আন্তর্জাতিক ফ্যাশন ব্র্যান্ডগুলোর কাছ থেকে অপেক্ষাকৃত উচ্চমূল্যের ও বিশেষায়িত পোশাকের কার্যাদেশ প্রতিনিয়ত বাড়ছে বাংলাদেশে। মৌলিক বা সাধারণ পোশাকের গণ্ডি পেরিয়ে দেশীয় পোশাক প্রস্তুতকারকরা এখন জ্যাকেট, স্যুট, ব্লেজার, বিয়ের পোশাক এবং টেকনিক্যাল অ্যাপারেলের মতো উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে তাদের উৎপাদন সক্ষমতা সম্প্রসারণ করছেন।
সংশ্লিষ্ট শিল্পের সূত্রমতে, জার্মানির হারকো নামের একটি ব্র্যান্ড, যারা উচ্চমূল্যের পোশাক ব্র্যান্ড হিসেবে পরিচিত, গত ছয় মাস ধরে বাংলাদেশের টিম গ্রুপ-এর একটি কারখানায় পোশাক তৈরি করছে।
একইভাবে ডেনমার্কের বিশ্বখ্যাত ফ্যাশন জায়ান্ট– বেস্টসেলার গ্রুপের মালিকানাধীন স্পেনভিত্তিক ব্র্যান্ড বালমোহক প্রায় ছয় মাস আগে বাংলাদেশের একটি শীর্ষস্থানীয় পোশাক কারখানায় বটম প্যান্টসহ কিছু পণ্যের ক্রয়াদেশ দিয়েছে, যা অপেক্ষাকৃত বাড়তি দরের।
কেবল এ দুটি প্রতিষ্ঠানই নয়, বাংলাদেশের পোশাক রপ্তানিকারকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ইউরোপ, আমেরিকা, জাপানসহ বিভিন্ন বড় বড় বাজারের মৌলিক পণ্যের বাইরের হায়ার-এন্ড বা দামি পোশাকের ব্র্যান্ডগুলো গত চার, পাঁচ বছর ধরে বাংলাদেশমুখী হচ্ছে। নতুন নতুন ব্র্যান্ড এর পাশাপাশি যারা বিদ্যমান কাস্টমার– তারাও স্থানীয় উৎপাদকদের সঙ্গে ব্যবসা বাড়াচ্ছে। তবে তীব্র প্রতিযোগিতার কারণে কারখানাগুলো তাদের ক্লায়েন্ট লিস্ট গোপন রাখে।
রপ্তানিকারকরা জানান, বাংলাদেশে তৈরি কিছু বিশেষায়িত ব্লেজার এবং ওয়েডিং গাউন আন্তর্জাতিক বাজারে ১,০০০ ডলারেরও বেশি খুচরামূল্যে বিক্রি হচ্ছে।
শিল্পমালিকরা জানান, গত চার বছরে এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট, মন্টবেল, ভিক্টোরিয়াস সিক্রেট এবং ৫.১১ ট্যাকটিক্যালের মতো বিশ্বখ্যাত সব প্রিমিয়াম ব্র্যান্ড—সরাসরি বা থার্ড পার্টির মাধ্যমে বাংলাদেশের কারখানাগুলোতে উচ্চমূল্যের এসব পোশাকের ক্রয়াদেশ দিয়েছে।
তবে ব্র্যান্ড এবং রপ্তানিকারকরা 'বিজনেস সিক্রেটস' এর কারণে তথ্য গোপন রাখায় বেশিরভাগ ব্র্যান্ড সম্পর্কে বিস্তারিত জানা যায় না।
বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) পরিচালক ও উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানিকারক শেখ মুস্তাফিজ টিবিএসকে বলেন, "হাইভ্যালুর পোশাক বিক্রির জন্য আন্তর্জাতিক বাজারে সুপরিচিত অন্তত ২০টি নতুন ব্র্যান্ড গত পাঁচ বছরে বাংলাদেশে অর্ডার দিতে শুরু করেছে।"
সম্প্রতি যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি রাজনৈতিক সমাবেশে পরা স্যুট আলোচনার জন্ম দেয়, যা বাংলাদেশের অনন্ত গ্রুপ-এর গার্মেন্টস তৈরি করে বলে দাবি কারখানা মালিকদের। এ ঘটনায় দেশীয় কারখানাগুলোর এই নতুন সক্ষমতা সবার নজর কাড়ে। এর আগে মার্কিন নভোচারীরা, যারা গত এপ্রিলে চাঁদ প্রদক্ষিণ করেছেন, তাদের পোশাক বাংলাদেশের আশুলিয়ার আরেকটি কারখানায় তৈরি হয় বলে জানিয়েছিলেন মালিকপক্ষ।
এ দুটি ঘটনার পর বাংলাদেশ যে অনেকটা নীরবে উচ্চমূ্ল্যের এবং নামকরা ব্র্যান্ডগুলোর পোশাক তৈরিতে অনেকদূর এগিয়েছে, তা নতুন করে আলোচনার খোরাক তৈরি করে। কারণ বাংলাদেশ মূলত স্বল্পমূল্যের পোশাক তৈরি করে বলেই প্রচারণা রয়েছে, আর বৈশ্বিক ক্রেতারাও এতদিন ধরে তাই জেনে আসছেন।
উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানির নানা হিসাব
উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন, ১৯৮০'র দশকে শুরু হওয়া গার্মেন্টস শিল্প ২০০০ সাল পর্যন্ত মূলত বেসিক বা কম দামের পণ্য তৈরি করতো। এর পর থেকে কিছু কারখানা খুবই স্বল্প পরিমাণে উচ্চ মূ্ল্যের পোশাকের ক্রয়াদেশ পেতে শুরু করে। তবে ২০১০ সালের পর থেকে এর আওতা বাড়তে শুরু করে। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট রপ্তানিকৃত পোশাকের ১০–১৫ শতাংশ উচ্চমূল্যের পোশাক বলে জানিয়েছেন তারা। কেউ কেউ এর হিস্যা ২০ শতাংশ হতে পারে বলেও মনে করেন। যদিও এই রপ্তানির বিশ্বাসযোগ্য কোনো পরিসংখ্যান সরকারি বা বেসরকারি পর্যায়ে পাওয়া যায় না বলে জানান তাঁরা।
তবে পরিমাণ নিয়ে মতভেদ থাকলেও, তারা সবাই স্বীকার করেছেন, গত এক দশকে রপ্তানি পোশাকের মধ্যে উচ্চমূল্যের পোশাকের হিস্য্যা বাড়ছে। কেউ কেউ বলছেন, এটি দ্বিগুণ বা তার চেয়ে বেশি হয়েছে।
বিজিএমইএ সহ-সভাপতি মিজানুর রহমান টিবিএস'কে বলেন, "এক দশক আগেও বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির হয়ত ৩ শতাংশ ছিল প্রিমিয়াম প্রোডাক্ট, যা এখন ১০ শতাংশের মত হতে পারে।"
একই কথা বলেছেন বিজিএমইএ পরিচালক শেখ মুস্তাফিজ। তিনি বলেন, এক দশক আগে ২০০ কোটি ডলারের মত উচ্চমূল্যের পোশাক রপ্তানি করতো বাংলাদেশ, যা এখন ৫০০ কোটি ডলারের উপরে।
বেসরকারি সংস্থা 'বাংলাদেশ অ্যাপারেল ভয়েস'-এর ২০২৬ সালের সেপ্টেম্বরের এক বিশ্লেষণ অনুযায়ী, আউটারওয়্যার, ড্রেসেস, স্পোর্টসওয়্যার, টেকনিক্যাল ওয়্যার এবং স্যুটের মতো উন্নত ও উচ্চমূল্যের পোশাকের ক্যাটাগরিগুলো ২০২৫ সালে বাংলাদেশের মোট পোশাক রপ্তানির মাত্র ৯.৩৫ শতাংশ ছিল। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো (ইপিবি) এবং ইন্টারন্যাশনাল ট্রেড সেন্টারের (আইটিসি) তথ্যের ওপর ভিত্তি করে প্রণীত এই বিশ্লেষণে আরও দেখা যায় যে, ওই একই সময়ে আন্তর্জাতিক তৈরি পোশাক বাজারে এসব উন্নত ও প্রিমিয়াম পণ্যের সমন্বিত হিস্যা ছিল ৩০.৪৬ শতাংশ।
টিম গ্রুপের সহযোগী প্রতিষ্ঠান ফোরএ ইয়ার্ন ডাইং-এর মার্চেন্ডাইজিং, মার্কেটিং ও বিজনেস অপারেশনের সিনিয়র জেনারেল ম্যানেজার মেহেদী হাসান আসিফ মনে করেন, দেশের মোট পোশাক রপ্তানিতে উচ্চমূল্যের পোশাকের বর্তমান হিস্যা এখন প্রায় ২০ শতাংশ ছুঁয়েছে।
২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশ পোশাক রপ্তানি থেকে মোট প্রায় ৩৮.৭০ বিলিয়ন ডলার আয় করেছে। এর ১০ থেকে ১৫ শতাংশ যদি উচ্চমূল্যের পোশাকের দখলে থাকে, তাহলে আর্থিক হিসাবে এর রপ্তানি মূল্য দাঁড়ায় প্রায় ৩.৮৭ বিলিয়ন থেকে ৫.৮১ বিলিয়ন ডলার।
উচ্চমূল্যের পোশাক উৎপাদন সম্প্রসারণ করছেন উদ্যোক্তারা
টিম গ্রুপের কর্মকর্তা আসিফ জানান, টিম গ্রুপের প্রতিষ্ঠানগুলো বছরে প্রায় ১২০ মিলিয়ন ডলার সমমূল্যের জ্যাকেট ও নানা ধরণের আউটারওয়্যার বিশ্ববাজারে রপ্তানি করে, যার প্রায় ৬০ শতাংশই উচ্চমূল্যের প্রিমিয়াম মার্চেন্ডাইজ। গ্রুপের মোট রপ্তানি আয় বছরে ৩০০ মিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গেছে, যার মধ্যে আউটারওয়্যারের অংশ প্রায় ৪০ শতাংশ।
তিনি আরও জানান, টমি হিলফিগার, কেলভিন ক্লেইন, এনগেলবার্ট স্ট্রস, শোফেল, স্কট, কারহার্ট এবং মন্টবেলের মতো বিখ্যাত বিশ্বমানের ব্র্যান্ডগুলোতে তাদের কারখানা থেকে নিয়মিত পোশাক সরবরাহ করা হয়।
আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে (ইপিজেড) অবস্থিত ইউবিএফ ব্রাইডাল লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান ব্রাইডাল ড্রেস তৈরি করে, আন্তর্জাতিক বাজারে যার প্রতিটির খুচরামূল্য ৪০০ থেকে ১,০০০ ডলারের মধ্যে। প্রতিষ্ঠানটির দেওয়া তথ্যানুযায়ী, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তারা যে ৫ মিলিয়ন ডলারের বেশি পোশাক রপ্তানি করেছে, তার প্রায় পুরোটাই ছিল উচ্চমূ্ল্যের।
এনার্জি প্যাক ফ্যাশনস লিমিটেড নামের একটি প্রতিষ্ঠান বছরে প্রায় ১০০ মিলিয়ন ডলারের পোশাক রপ্তানি করে, যার প্রায় ৯০ শতাংশই উচ্চমূ্ল্যের স্যুট ও ব্লেজার বলে জানিয়েছেন প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান হুমায়ুন রশীদ।
তিনি বলেন, আমাদের রপ্তানি করা কোন কোন ব্লেজারের রিটেইল প্রাইস (খুচরামূল্য) ৯০০ ইউরো পর্যন্ত।
রশীদ জানান, আন্তোনিও নামে ইতালির একজন বায়ার ইতালিতে তার নিজস্ব বুটিক শপের জন্য ব্লেজার তৈরি করেন বাংলাদেশে আমাদের প্রতিষ্ঠানে। তিনি ইতালিয়ান ফেব্রিক ও নিজস্ব ডিজাইন দিয়ে এখানে পণ্য তৈরি করিয়ে নেন।
বাংলাদেশে তৈরি পোশাক খাতের প্রায় ৩,০০০ রপ্তানিমুখী কারখানা রয়েছে। তবে সুনির্দিষ্টভাবে কতগুলো কারখানা উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরিতে যুক্ত, তার সুনির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই। হাতে গোণা কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বাদে কেউই রপ্তানির পুরোটাই উচ্চমূল্যের পোশাক তৈরি করে না। সেই হিসেবে এই সংখ্যা ১০০-এর বেশি হতে পারে বলে বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ'র নেতারা জানিয়েছেন।
এখাতের উৎপাদনকারীদের তালিকায় রয়েছে, ইয়ংওয়ান কর্পোরেশন, ডিবিএল গ্রুপ, টিম গ্রুপ, স্নোটেক্স, এপিলিয়ন, এসকিউ গ্রুপ, স্কয়ার, উর্মি, ইউনিভার্সাল, ফকির গ্রুপ এবং অনন্ত গ্রুপ- এর মতো বড় প্রতিষ্ঠান।
কেবল বেশি দাম হলেই উচ্চমূল্যের পোশাক নয়
পোশাকশিল্পের প্রতিনিধিরা জানান, আন্তর্জাতিক বাজারে কোনো পোশাকের খুচরামূল্য ৫০ ডলারের বেশি হলে সেটি উচ্চমূল্যের হিসেবে বিবেচিত হয়। তবে সব ব্র্যান্ড এটিকে উচ্চমূল্যের হিসেবে বিবেচনা করেন না। কেউ কেউ আবার 'স্ট্যান্ডার্ড মিনিট ভ্যালু' বা এসএমভি-কে মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করেন—যা একজন দক্ষ শ্রমিকের মাধ্যমে, সুনির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে কোনো নির্দিষ্ট পোশাক বা অপারেশন সম্পাদন করতে ব্যয়িত সুনির্দিষ্ট সময় নির্দেশ করে।
কারখানা মালিকদের তথ্যানুযায়ী, ওভেন পোশাকের ক্ষেত্রে এসএমভি ৫০ মিনিট বা তার বেশি, এবং নিটওয়্যারের ক্ষেত্রে ১২ মিনিটের বেশি হলে—সেটিকে উচ্চমূল্যের পোশাক হিসেবে শ্রেণিবদ্ধ করা হয়ে থাকে। তবে এই মানদণ্ডও সব ক্ষেত্রে সার্বজনীন নয়।