স্ট্রোক এমন একটি জরুরি চিকিৎসাজনিত পরিস্থিতি, যেখানে প্রতিটি মিনিট অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হঠাৎ মুখ বেঁকে যাওয়া, শরীরের এক পাশ অবশ বা দুর্বল হয়ে পড়া, কথা জড়িয়ে যাওয়া কিংবা কথা বলতে অসুবিধা হওয়া—এসব স্ট্রোকের লক্ষণ হতে পারে। এ সময় রোগীকে দ্রুত হাসপাতালে নেওয়া গেলে মৃত্যুঝুঁকি কমানো এবং স্থায়ী পঙ্গুত্ব প্রতিরোধের সুযোগ তৈরি হয়। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দেওয়ার পরও অনেকে বাড়িতে অপেক্ষা করেন, ঝাড়ফুঁক বা ঘরোয়া চিকিৎসার আশ্রয় নেন কিংবা হাসপাতালে যেতে দেরি করেন। এই বিলম্ব রোগীর জন্য ভয়াবহ পরিণতি ডেকে আনতে পারে।
স্ট্রোকের লক্ষণ দেখা দিলে প্রথম কাজ হলো দ্রুত জরুরি চিকিৎসার ব্যবস্থা করা। রোগীকে যত দ্রুত সম্ভব এমন হাসপাতালে নিতে হবে, যেখানে মস্তিষ্কের সিটি স্ক্যান বা এমআরআই এবং প্রয়োজনীয় স্ট্রোক চিকিৎসার সার্বক্ষণিক ব্যবস্থা রয়েছে।
স্ট্রোকের লক্ষণ মনে রাখার সহজ উপায় হলো 'BE FAST':
B—Balance: হঠাৎ শরীরের ভারসাম্য হারানো বা হাঁটতে অসুবিধা হওয়া। E—Eyes: হঠাৎ দৃষ্টিশক্তি কমে যাওয়া বা চোখে ঝাপসা দেখা। F—Face: মুখের এক পাশ বেঁকে যাওয়া। A—Arms: এক হাত বা পা দুর্বল হয়ে যাওয়া কিংবা অবশ লাগা। S—Speech: কথা জড়িয়ে যাওয়া বা অন্যের কথা বুঝতে অসুবিধা হওয়া। T—Time: সময় নষ্ট না করে দ্রুত জরুরি চিকিৎসার উদ্যোগ নেওয়া।
এগুলোর যেকোনো একটি লক্ষণ হঠাৎ দেখা দিলেও স্ট্রোকের আশঙ্কা করতে হবে। লক্ষণ কয়েক মিনিটের মধ্যে নিজে থেকে ভালো হয়ে গেলেও কোনোভাবেই অবহেলা করা যাবে না। এটি ক্ষণস্থায়ী মস্তিষ্কের রক্তপ্রবাহের সমস্যা বা 'ট্রানজিয়েন্ট ইস্কেমিক অ্যাটাক' (টিআইএ) হতে পারে, যা ভবিষ্যতের বড় ধরনের স্ট্রোকের আগাম সতর্কসংকেত।
স্ট্রোকের ক্ষেত্রে প্রতিটি মিনিটই অত্যন্ত মূল্যবান। মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে আক্রান্ত অংশে রক্ত ও অক্সিজেনের সরবরাহ থেমে যায় বা কমে যায়। ফলে মস্তিষ্কের কোষ দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হতে থাকে। বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে প্রতি মিনিটে প্রায় ১৯ লাখ স্নায়ুকোষ নষ্ট হতে পারে। যত দেরিতে চিকিৎসা শুরু হয়, মস্তিষ্কের স্থায়ী ক্ষতি, পঙ্গুত্ব ও মৃত্যুর ঝুঁকি তত বাড়ে। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছালে উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে 'থ্রম্বোলাইসিস' বা 'মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি'র মাধ্যমে রক্তপ্রবাহ পুনরায় ফিরিয়ে আনা সম্ভব। তাই মুখ বেঁকে যাওয়া, হাত দুর্বল হওয়া বা কথা জড়িয়ে যাওয়ার মতো লক্ষণ দেখা দিলে এক মুহূর্তও দেরি নয়—দ্রুত হাসপাতালে নিতে হবে। মনে রাখবেন, স্ট্রোকে সময়ই মস্তিষ্ক, সময়ই জীবন।
স্ট্রোক প্রধানত দুই ধরনের। ইস্কেমিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের কোনো রক্তনালিতে রক্ত জমাট বেঁধে রক্তপ্রবাহ বন্ধ হয়ে যায়। অন্যদিকে, হেমোরেজিক স্ট্রোকে মস্তিষ্কের রক্তনালি ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হয়।
দুই ধরনের স্ট্রোকের চিকিৎসা সম্পূর্ণ আলাদা। তাই রোগী হাসপাতালে পৌঁছানোর পর দ্রুত সিটি স্ক্যান বা প্রয়োজন অনুযায়ী এমআরআই করে স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। পরীক্ষা ছাড়া কেবল লক্ষণ দেখে স্ট্রোকের ধরন নিশ্চিত হওয়া যায় না।
এ কারণে চিকিৎসকের সুনির্দিষ্ট পরামর্শ ছাড়া রোগীকে অ্যাসপিরিন, ক্লোপিডোগ্রেল বা রক্ত পাতলা করার ওষুধ সেবন করানো মারাত্মক বিপজ্জনক হতে পারে। রক্তক্ষরণজনিত স্ট্রোক হলে এসব ওষুধ পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও প্রাণঘাতী করে তুলতে পারে।
রক্তনালি বন্ধ হলে কার্যকর চিকিৎসা রয়েছে
ইস্কেমিক স্ট্রোকের ক্ষেত্রে দ্রুত চিকিৎসা শুরু করা গেলে মস্তিষ্কের বড় ক্ষতি ঠেকানোর সুযোগ থাকে। উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে শিরাপথে রক্ত জমাট গলানোর ওষুধ (থ্রম্বোলাইসিস) দেওয়া যায়। সাধারণত উপসর্গ শুরুর সাড়ে চার ঘণ্টার মধ্যে এই চিকিৎসা দিতে হয়। তবে রোগীর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থা, সিটি স্ক্যানের ফলাফল, রক্ত পরীক্ষাসমূহ এবং ওষুধ দেওয়ার ক্ষেত্রে কোনো ঝুঁকি বা বাধা আছে কি না, তা পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবেচনা করে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক সিদ্ধান্ত নেন।
কিছু নির্বাচিত রোগীর ক্ষেত্রে উন্নত ইমেজিং প্রযুক্তির সহায়তায় সাড়ে চার ঘণ্টার পরও এ চিকিৎসা দেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।
বড় রক্তনালি বন্ধ হয়ে গেলে, অর্থাৎ 'লার্জ ভেসেল অক্লুশন' (এলভিও) হলে 'মেকানিক্যাল থ্রম্বেকটমি' অত্যন্ত কার্যকর ও জীবনরক্ষাকারী চিকিৎসা। এ পদ্ধতিতে সাধারণত কুঁচকি বা হাতের ধমনির মধ্য দিয়ে সূক্ষ্ম ক্যাথেটার প্রবেশ করিয়ে মস্তিষ্কের বন্ধ রক্তনালিতে পৌঁছানো হয়। এরপর বিশেষ যন্ত্রের সাহায্যে জমাট বাঁধা রক্ত অপসারণ করে স্বাভাবিক রক্তপ্রবাহ ফিরিয়ে আনা হয়।
উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে দ্রুত থ্রম্বেকটমি করানো গেলে মৃত্যুঝুঁকি ও দীর্ঘমেয়াদি শারীরিক অক্ষমতা বহুলাংশে কমানো সম্ভব। ক্ষেত্রবিশেষে উপসর্গ শুরুর ২৪ ঘণ্টা পর্যন্ত সময়ের মধ্যেও এ চিকিৎসা কার্যকর ফল দিতে পারে। তবে সব রোগী এই চিকিৎসার উপযুক্ত নন। এর জন্য দ্রুত সিটি অ্যানজিওগ্রাফি বা প্রয়োজনীয় রক্তনালির ইমেজিং এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের সঠিক মূল্যায়ন জরুরি।
মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ হলে চিকিৎসার প্রধান লক্ষ্য থাকে রক্তচাপ দ্রুত ও কার্যকরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা, রক্তক্ষরণ বৃদ্ধি রোধ করা, মস্তিষ্কের ভেতরের অতিরিক্ত চাপ সামলানো এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অস্ত্রোপচার বা এন্ডোভাসকুলার চিকিৎসার ব্যবস্থা করা।
কিছু রোগীর ক্ষেত্রে রক্তনালির অস্বাভাবিক স্ফীতি বা 'অ্যানিউরিজম' ফেটে গিয়ে রক্তক্ষরণ হতে পারে। পরিস্থিতি ও জটিলতা অনুযায়ী ক্লিপিং, কয়েলিং বা আধুনিক কোনো পদ্ধতিতে রক্তক্ষরণের মূল উৎসটি বন্ধ করার প্রয়োজন হয়। এ ক্ষেত্রে রোগীকে সার্বক্ষণিক পর্যবেক্ষণের জন্য বিশেষায়িত স্ট্রোক ইউনিট বা নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) রেখে চিকিৎসা দিতে হয়।
স্ট্রোকের রোগীকে কোনো অবস্থাতেই মুখে খাবার, পানি বা কোনো ধরনের ওষুধ দেবেন না। কারণ, স্ট্রোকের কারণে রোগীর গিলতে সমস্যা হতে পারে এবং খাবার বা পানি শ্বাসনালিতে ঢুকে ফুসফুসের মারাত্মক ক্ষতি বা শ্বাসরোধ হতে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া রক্তচাপ দ্রুত কমানোর ভুল চেষ্টা করবেন না। রোগীকে জোর করে হাঁটাচলা করানো, শরীর বা মাথায় মালিশ করা কিংবা ঝাড়ফুঁক ও কবিরাজি চিকিৎসার পেছনে মূল্যবান সময় নষ্ট করা একেবারেই অনুচিত।
রোগী কখন শেষবার সম্পূর্ণ স্বাভাবিক ও সুস্থ ছিলেন, সেই সুনির্দিষ্ট সময়টি পরিবারকে মনে রাখতে হবে। উপসর্গ কখন শুরু হয়েছে, রোগী নিয়মিত কী কী ওষুধ সেবন করেন এবং আগে থেকে ডায়াবেটিস, উচ্চ রক্তচাপ কিংবা হৃদরোগ আছে কি না—এসব তথ্য পৌঁছামাত্র চিকিৎসককে নির্ভুলভাবে জানান। রোগী অচেতন হয়ে পড়লে শ্বাস-প্রশ্বাস পর্যবেক্ষণ করুন এবং দ্রুত জরুরি অ্যাম্বুলেন্সের সহায়তা নিন।
প্রতিরোধের পাশাপাশি জরুরি চিকিৎসার প্রস্তুতি
স্ট্রোকের ঝুঁকি এড়াতে উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস ও রক্তে ক্ষতিকর কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণ, ধূমপান ও তামাক বর্জন, নিয়মিত কায়িক পরিশ্রম বা ব্যায়াম এবং স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গড়ে তোলা অপরিহার্য। অনিয়মিত হৃৎস্পন্দন, বিশেষ করে 'অ্যাট্রিয়াল ফিব্রিলেশন' থাকলে তা দ্রুত শনাক্ত করে সঠিক চিকিৎসা নেওয়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
পাশাপাশি জাতীয় পর্যায়ে প্রয়োজন স্ট্রোক চিকিৎসার জন্য সার্বক্ষণিক প্রস্তুত বিশেষায়িত হাসপাতাল, প্রশিক্ষিত চিকিৎসক দল, দ্রুত ইমেজিং ব্যবস্থা এবং উপযুক্ত রোগীর ক্ষেত্রে থ্রম্বোলাইসিস ও থ্রম্বেকটমির সার্বিক সুবিধা। সর্বোপরি, সাধারণ মানুষের মাঝে স্ট্রোকের প্রাথমিক লক্ষণসমূহ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে হবে, যেন উপসর্গ দেখা মাত্রই রোগীকে এক মুহূর্ত দেরি না করে বিশেষায়িত হাসপাতালে নেওয়া সম্ভব হয়।
মনে রাখতে হবে, স্ট্রোকের চিকিৎসায় সময় অপচয়ের কোনো সুযোগ নেই। দ্রুত হাসপাতালে পৌঁছানো, সঠিক সময়ে নির্ভুল রোগ নির্ণয় এবং কালক্ষেপণ না করে উপযুক্ত চিকিৎসা শুরু করা—এই তিনটি পদক্ষেপই পারে রোগীর অমূল্য জীবন বাঁচাতে ও তাকে সুস্থ-স্বাভাবিক জীবনে ফিরিয়ে আনতে। স্ট্রোকে কোনো দ্বিধা বা অপেক্ষা নয়, দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নিন।
বিশেষ দ্রষ্টব্য: নিবন্ধের বিশ্লেষণটি লেখকের নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গি ও পর্যবেক্ষণের প্রতিফলন। অবধারিতভাবে তা দ্য বিজনেস স্ট্যান্ডার্ড-এর অবস্থান বা সম্পাদকীয় নীতির প্রতিফলন নয়।
While most comments will be posted if they are on-topic and not abusive, moderation decisions are subjective. Published comments are readers’ own views and The Business Standard does not endorse any of the readers’ comments.