সবার আগে চট্টগ্রামের উন্নয়ন-এই নীতিতে বিশ্বাসী ছিলেন এবিএম মহিউদ্দিন চৌধুরী। মেয়র থাকা অবস্থায় যখন যে দলই ক্ষমতায় থাকুক, চট্টগ্রামের স্বার্থে আন্দোলন করতে দ্বিতীয়বার ভাবতেন না তিনি।
১৯৯৪ সাল থেকে টানা তিনবার চট্টগ্রাম সিটির মেয়র নির্বাচিত হয়ে ১৬ বছর দায়িত্ব পালন করেন মহিউদ্দিন। তিনি মেয়র নির্বাচিত হন বিএনপি সরকারের আমলে। সে সময় নিজের দল ক্ষমতায় না থাকলেও চট্টগ্রামের জন্য সংগ্রাম করেছেন জোরালোভাবে। তার হাত ধরেই চট্টগ্রাম আধুনিক নগরীর রূপ পায় বলে অনেকে মনে করেন।
মহিউদ্দিন চৌধুরীর জীবনে রয়েছে নানা সংগ্রামী ঘটনা। নানা ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে এগিয়ে যেতে হয়েছে তাকে। তিনি যখন চট্টগ্রামের লালদীঘিতে হাজির হতেন তখন তার জ্বালাময়ী বক্তব্য শোনার জন্য হাজার হাজার মানুষ জড়ো হতেন।
রাজনৈতিক জীবনের শুরতেই সান্নিধ্যে আসেন জননেতা জহুর আহমদ চৌধুরীর। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ডাকে আন্দোলন-সংগ্রামে অংশ নিতে গিয়ে পাক বাহিনীর কাছে গ্রেফতার হন অসংখ্যবার। মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিতে গিয়ে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থা আইএসআইয়ের চট্টগ্রাম নেভাল একাডেমি সদর দফতরের কাছে গ্রফতার হয়ে অমানুষিক নির্যাতনের শিকার হন দীর্ঘ চারমাস।
দেশ স্বাধীনের পর বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে জহুর আহমদ চৌধুরীর নেতৃত্বে ঝাপিয়ে পড়েন নতুন সংগ্রামে। বঙ্গবন্ধুর খুবই কাছের আর আদরের ছাত্রনেতা ছিলেন মহিউদ্দিন।
কিছুদিন না যেতেই ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে নিহত হন বঙ্গবন্ধু। অল্পের জন্য মহিউদ্দিন ধরা পড়া থেকে বেঁচে যান, মৃত্যুবরণ করেন সাথী মৌলভি সৈয়দ। পালিয়ে গিয়ে ভারতে প্রতিবিপ্লবীদের সঙ্গে যোগ দেন। লক্ষ্য সামরিক জান্তা, খুনি মোশতাককে সামরিকভাবেই পরাস্ত করা। কিছুদিন পরেই দলের নির্দেশে পন্থা পরিবর্তন করে আবার সক্রিয় হন প্রকাশ্য রাজনীতিতে।
দেশে এসেই সামরিক বাহিনীর হাতে নির্যাতন, আর একের পর এক কারাভোগ। তখন জিয়াউর রহমান ক্ষমতায়। দলের নির্দেশে চলে বৈপ্লবীক প্রতিবাদ আর প্রতিরোধ। তরুণ ছাত্রনেতা মহিউদ্দিনের জুজু-তে সরকারের কর্তা ব্যক্তিরা তটস্হ। মাঝে আওয়ামী লীগের ভেতরেই ষড়যন্ত্রকারীরা তৎপর হয়ে উঠল। বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনার ভূমিকাকে নগণ্য করতে তাকে ঠেকাতে শত্রুরা উঠেপড়ে বসল। অদম্য সাহসী মহিউদ্দিন চট্টগ্রাম থেকে ঢাকায় এসে দলবল নিয়ে বঙ্গবন্ধু কন্যার জন্য ঝাঁপিয়ে পড়েন। সব বাধা অতিক্রম করে শেখ হাসিনাকে দলের কাণ্ডারির দায়িত্ব নিতে সহায়তা করেন।
তারপর আসলো স্বৈরাচারী সামরিক জান্তা এরশাদ। তারই শাসনামলে চট্টগ্রামে স্বয়ং জান্তা প্রধানকে অবান্চিত ঘোষণা করে চক্ষুশূল হন সরকারের। ফলে আবারও রাজনৈতিক বন্দী। ততদিনে চট্টগ্রামের আপামর জনতার নয়নমণি হয়ে ওঠেন মহিউদ্দিন চৌধুরী।
পরবর্তীতে নব্বইয়ের গণআন্দোলনে অগ্রণী ভূমিকা রেখে গণতান্ত্রিক প্রগতিশীল শক্তির অন্যতম সুপুরষ বলে বিবেচিত হন সর্বমহলে।
জনগণের ভোটে তিন তিনবার মেয়র নির্বাচিত হন মহিউদ্দিন। আজ শুক্রবার ভোরে চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেন এই নেতা। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৪ বছর। দীর্ঘদিন কিডনি রোগে ভুগছিলেন তিনি।