বাংলাদেশ ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে নতুন বাণিজ্য চুক্তি দক্ষিণ এশিয়ার বস্ত্র বাণিজ্যে নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। বিশেষ করে মার্কিন তুলা ব্যবহার করা বাংলাদেশি পোশাকের জন্য শূন্য শুল্ক সুবিধা যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে প্রতিযোগিতার হিসাব পাল্টে দিতে পারে। এতে ভারতের বস্ত্র ও তুলা খাতের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ দেখা দিয়েছে।
ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডে’র এক বিশ্লেষণে বলা হচ্ছে, বাংলাদেশের সঙ্গে চুক্তির আওতায় যুক্তরাষ্ট্র গড়ে ১৯ শতাংশ শুল্ক নির্ধারণ করলেও কিছু পোশাকপণ্যের ক্ষেত্রে পুরোপুরি শুল্কমুক্ত সুবিধা দিয়েছে। তবে এই সুবিধা প্রযোজ্য হবে কেবল সেসব পোশাকের জন্য, যেগুলো উৎপাদনে যুক্তরাষ্ট্রের তুলা বা কৃত্রিম তন্তু ব্যবহার করা হবে।
এর আগে গত সপ্তাহ আগেই যুক্তরাষ্ট্র ভারতের সঙ্গে আলাদা বাণিজ্য সমঝোতায় পৌঁছায়। সেখানে ভারতীয় পণ্যের ওপর শুল্কহার নির্ধারিত হয় ১৮ শতাংশ, যা আগের ৫০ শতাংশের তুলনায় অনেক কম। শুরুতে এতে ভারতীয় বস্ত্র রপ্তানিকারকদের মধ্যে স্বস্তি দেখা গেলেও বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র চুক্তির বিস্তারিত শর্ত সামনে আসার পর সেই স্বস্তি অনেকটাই ম্লান হয়ে গেছে।
কারণ, বাস্তবে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে ভারতীয় পোশাকের ওপর ১৮ শতাংশ শুল্ক বহাল থাকবে, আর একই বাজারে মার্কিন তুলা দিয়ে তৈরি বাংলাদেশি পোশাক ঢুকবে শুল্ক ছাড়াই। এতে দাম ও প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ স্পষ্ট সুবিধা পেতে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্র ভারতের বস্ত্র ও পোশাক রপ্তানির সবচেয়ে বড় বাজার। দেশটিতে ভারতের বার্ষিক বস্ত্র রপ্তানির পরিমাণ প্রায় ১০ দশমিক ৫ বিলিয়ন ডলার, যা মোট রপ্তানির প্রায় ৩০ শতাংশ। ভারতের জিডিপিতে এই খাতের অবদান ২ দশমিক ৩ শতাংশ। অতীতে রুশ তেল কেনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শুল্ক আরোপে ভারতীয় রপ্তানি কমে যাওয়ায় খাতটি বড় চাপের মুখে পড়ে। সে কারণে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত বাণিজ্য চুক্তিকে বস্ত্র খাতের জন্য পুনরুদ্ধারের সুযোগ হিসেবে দেখা হচ্ছিল।
তবে বাংলাদেশের জন্য দেওয়া বিশেষ ছাড় সেই প্রত্যাশায় ভাটা দিতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুল্কের সামান্য পার্থক্যের চেয়েও শূন্য শুল্ক সুবিধার প্রভাব অনেক বেশি। এতে যুক্তরাষ্ট্রের ক্রেতাদের কাছে বাংলাদেশি পোশাক তুলনামূলকভাবে সস্তা ও আকর্ষণীয় হয়ে উঠবে।
এর প্রভাব শুধু পোশাকেই সীমাবদ্ধ নয়, তুলা বাণিজ্যেও পড়তে পারে। বাংলাদেশের রপ্তানির ৮০ শতাংশের বেশি আসে বস্ত্র খাত থেকে, ফলে দেশটি বিপুল পরিমাণ তুলা আমদানি করে। বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই বিশ্বের সবচেয়ে বড় তুলা আমদানিকারক এবং দীর্ঘদিন ধরে ভারতের তুলার প্রধান ক্রেতা ছিল।
তবে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক টানাপোড়েনের মধ্যে বাংলাদেশ ব্রাজিল ও পশ্চিম আফ্রিকার দেশগুলো থেকে তুলা আমদানি বাড়িয়েছে। নতুন চুক্তিতে মার্কিন তুলা ব্যবহারে বাড়তি সুবিধা পাওয়ায় বাংলাদেশ যুক্তরাষ্ট্রের তুলার দিকেই আরও বেশি ঝুঁকতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এতে ভারতীয় তুলা ব্যবসায়ীদের ওপর চাপ বাড়তে পারে।
এই উদ্বেগের প্রতিফলন দেখা গেছে ভারতের শেয়ারবাজারেও। সম্প্রতি বস্ত্র ও সুতা উৎপাদনকারী বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের শেয়ারের দাম কমেছে। বিষয়টি রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি করেছে। বিরোধী কংগ্রেস দল বলছে, এই পরিস্থিতিতে বাংলাদেশকে শূন্য শুল্ক সুবিধা দেওয়া ভারতের বস্ত্র খাতের জন্য ‘দ্বিমুখী আঘাত’।
কংগ্রেসের দাবি, এতে একদিকে ভারতীয় তুলাচাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন, অন্যদিকে সুতা ও পোশাক উৎপাদনকারী শিল্পেও চাপ বাড়বে। দলটির নেতারা মনে করছেন, লাখ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে যুক্তরাষ্ট্র–ভারত চূড়ান্ত বাণিজ্য চুক্তি সই হতে এখনো কিছু সময় বাকি। সে কারণে আলোচনার মাধ্যমে এই শর্তগুলো পুনর্বিবেচনার সুযোগ আছে বলেও মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। ভারত সরকার শেষ পর্যন্ত কী অবস্থান নেয়, সেদিকেই এখন নজর বাণিজ্য সংশ্লিষ্টদের।