কুমিল্লার দাউদকান্দিতে পুলিশের চেকপোস্টে উদ্ধারকৃত ৯৮ হাজার পিস ইয়াবা বিক্রি করে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের পর মাত্র ২ হাজার পিস উদ্ধার দেখিয়ে মামলা করা হয়। ইয়াবা বিক্রির দেড় কোটি টাকার সিংহভাগ ওসি এবং সার্কেলের পকেটে গেছে। গত বছরের ১৭ অক্টোবর দাউদকান্দি টোল প্লাজায় এ ঘটনা ঘটে। সম্প্রতি গণমাধ্যমের অনুসন্ধানে এ তথ্যসহ আরও বেশকিছু মাদক কেলেঙ্কারির ঘটনা বেরিয়ে এসেছে।
এদিকে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের দাউদকান্দি টোলপ্লাজা ও এর আশপাশের এলাকায় বিভিন্ন যানবাহনে তল্লাশি চালিয়ে উদ্ধারকৃত মাদকের সিকি ভাগও জব্দ তালিকায় উঠে না এবং মামলাও হয় না। অভিযোগ রয়েছে, চেকার রফিক সিন্ডিকেট ও মালখানা অফিসার এসআই রবিউলের মাধ্যমে এসব মাদক বিক্রি করে দেওয়া হচ্ছে। ওই থানা পুলিশের অভ্যন্তরে টোল প্লাজার চেকপোস্টের ডিউটি ‘বেচাকেনা’ চলছে।
সরেজমিন ঘুরে জানা গেছে, দাউদকান্দি টোল প্লাজা, বলদাখাল, আমিরাবাদসহ আশপাশের এলাকায় চেকপোস্ট পরিচালনা করছে দাউদকান্দি থানা পুলিশ। এসব চেকপোস্টের মূলে রয়েছে মাদকের গডফাদার চেকার রফিক সিন্ডিকেট। সোর্সের মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে পুলিশের উপস্থিতিতে মাদক উদ্ধার করে এ সিন্ডিকেট।
পুলিশের সদস্য না হয়েও রফিক ও তার সিন্ডিকেটের সদস্যরা দাউদকান্দি টোল প্লাজায় যানবাহনে নিয়মিত তল্লাশি চালায়। মাদক উদ্ধারের পাশাপাশি যানবাহনের যাত্রী সাধারণকে তল্লাশির নামে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত ও হয়রানি করা হয়। এদিকে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী যানবাহনে তল্লাশি করে প্রায়ই মাদক উদ্ধার করা হয়। ওসি এবং সার্কেলের শেলটারে মালখানা অফিসার এসআই রবিউল ও চেকার রফিক এসব মাদক বিক্রি করছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ১৭ অক্টোবর টোল প্লাজায় কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী একটি প্রাইভেটকারে তল্লাশি করেন থানার এসআই হুমায়ূন কবির ও তার সঙ্গীয় ফোর্স। এ সময় ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। পরে মাত্র ২ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার দেখিয়ে মামলা দায়ের করা হয়। ক্যারিয়ার কামাল হোসেন ও নিজাম উদ্দিনকে আসামি করে তদন্ত শেষ করে ৩০ নভেম্বর আদালতে চার্জশিট দেওয়া হয়।
ইয়াবার মালিক কক্সবাজারের আবির হোসেন জানান, ওই চালানে ১ লাখ ইয়াবা ছিল। কিন্তু এসআই হুমায়ূন কবির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের যোগশাজসে ৯৮ হাজার পিস ইয়াবা আত্মসাৎ করেন। যার মূল্য কমপক্ষে দেড় কোটি টাকা। চেকার রফিকের মাধ্যমে এই ইয়াবার চালান বিক্রি করে দেওয়া হয়।
প্রত্যক্ষদর্শী মিজানুর রহমান বলেন, ইয়াবার এতবড় চালান আমাদের সামনে উদ্ধার করা হয়েছে। পুলিশের ভয়ে আমরা এ নিয়ে মুখ খুলতে পারিনি। সেই অভিযানে এক লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধার করা হয়েছিল। বিষয়টি নিয়ে এখন দাউদকান্দি এলাকায় বেশ আলোচনা চলছে। তবে অভিযোগ অস্বীকার করে এসআই হুমায়ূন কবির বলেন, ‘যা পেয়েছি তা দিয়েই মামলা দিয়েছি।’
অভিযানে সংশ্লিষ্ট চেকার পন্ডিত রাজু বলেন, ১৭ অক্টোবর আমি নিজেই পুলিশের সঙ্গে থেকে প্রাইভেটকার থেকে ১ লাখ ইয়াবা উদ্ধার করেছি। চেকার রফিক এগুলো বিক্রি করে সার্কেল ওসি এবং অভিযানকারী টিমের মাঝে ভাগবাঁটোয়ারা করেছেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই ছোটন শর্মা বলেন, টোল প্লাজা থেকে এসআই হুমায়ূন কবির এসব ইয়াবা জব্দ করেছেন। সেখানে অতিরিক্ত ইয়াবা ছিল কিনা আমার জানা নেই। আমি মামলা পেয়ে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ শেষে ৩০ নভেম্বর চার্জশিট পাঠিয়ে দিয়েছি।
সূত্র জানায়, এক সপ্তাহ আগে কক্সবাজার থেকে ঢাকাগামী আইকনিক নামের একটি যাত্রীবাহী বাসে তল্লাশি চালিয়ে ১০ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেন চেকার রফিক ও সহযোগীরা। এ সময় মুহূর্তের মধ্যেই ইয়াবাগুলো গায়েব করে দেওয়া হয়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, ১৫ দিন আগে টোল প্লাজার চেকপোস্টে তল্লাশিকালে এসআই মহসিন এক হাজার পিস ইয়াবাসহ একটি মোটরসাইকেল আটক করেন। পরে ইয়াবাগুলো রেখে মাদক কারবারিকে ছেড়ে দেন।
এক সপ্তাহ আগে মোটরসাইকেল তল্লাশি করে মালখানা অফিসার এসআই রবিউল সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে ৮ হাজার পিস ইয়াবা জব্দ করেন। এসব ইয়াবা উদ্ধারসংক্রান্ত বিষয়ে কোনো মামলা হয়নি।
এ সময় অভিযানের সঙ্গে থাকা চেকার শাহ আলম বলেন, এসআই রবিউল সঙ্গীয় ফোর্স নিয়ে একটি মোটরসাইকেল থেকে ৮ হাজার পিস ইয়াবা উদ্ধার করেন। পরে ইয়াবাগুলো তিনি গায়েব করে দিয়েছেন। এক সপ্তাহ আগের ঘটনা এটি।
সূত্র জানায়, থানা পুলিশের জব্দ করা মাদক মালখানায় জমা করা হয়। এসব মাদক মালখানা অফিসার এসআই রবিউল অলটারনেটিভ (পরিবর্তন) করে সেখানে নকল মাদক রিপ্লেস করে রাখেন। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন এসআই রবিউল ইসলাম। তিনি বলেন, এগুলো আমার বিরুদ্ধে অপপ্রচার।
স্থানীয়রা জানান, চেকার রফিক তার সহযোগী সোহাগ, জসিম, ইকবাল, পন্ডিত রাজু, বাদশাসহ একটি সিন্ডিকেট চেকপোস্টে মাদকের রমরমা বাণিজ্য পরিচালনা করছেন। তারা দাউদকান্দি সার্কেলের সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফয়সাল তানভীরের খুব কাছের লোক বলে পরিচয় দেন। ইতোমধ্যে চেকার রফিকুল ইসলামের মাদকের ভাগবাঁটোয়ারাসংক্রান্ত একটি অডিও প্রতিবেদকের হাতে এসেছে। এতে তাকে বলতে শোনা যায়, আমরা সোর্সের কাজ করি। মাদক উদ্ধারের পর এগুলো নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন সার্কেল এবং ওসি স্যার। মাদক বিক্রি হলে এগুলো সবার মাঝে ভাগবাঁটোয়ারা হয়। সার্কেল স্যারের বিষয় নিয়ে আমার মুখ খোলা ঠিক হবে না। কারণ এটা আমার ঘর। কয়েকদিন আগে ৮ হাজার মাল (ইয়াবা) লুট হয়েছে। এগুলোর হিসাব আমাকেই দিতে হবে। পার্টি নিয়ে মাদক উদ্ধার করে ওসি এবং সার্কেলকে বুঝিয়ে দিতে হয়। আর বিক্রি করলে সবার মাঝে ভাগবাঁটোয়ারা করে দিতে হয়।
চেকার রফিক বলেন, আমরা পুলিশের সঙ্গে ডিউটি করি। মাদক উদ্ধার, বিক্রি, ভাগবাঁটোয়ারার সঙ্গে জড়িত নই। কেউ শত্রুতা করে আমার বিরুদ্ধে তথ্য দিতে পারে। এদিকে থানা পুলিশের একটি সূত্র জানায়, চেকপোস্টে ডিউটির একটি রোটেশন আছে। ঘুরেফিরে সব এসআই, এএসআই এখানে ডিউটি পান। কেউ যদি চেকপোস্টে ডিউটি করতে না চান সেটা অন্য অফিসারের কাছে বিক্রি করা যায়। একদিনের ডিউটি দশ হাজার টাকায় বিক্রি হয়।
দাউদকান্দি থানার ওসি এম আব্দুল হালিম বলেন, মাদক ও অপরাধ দমনে চেকপোস্ট পরিচালনা করা হয়। মাদক বিক্রি ও ভাগবাঁটোয়ারার বিষয়টি সঠিক নয়। কোনো অফিসার যদি মাদক কেলেঙ্কারির সঙ্গে জড়িত থাকে তাহলে তদন্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
দাউদকান্দি সার্কেলের সিনিয়র সহাকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) ফয়সাল তানভীর বলেন, মাদকের সঙ্গে আমার কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। চেকার রফিককে আমি চিনি না। ১ লাখ পিস ইয়াবা উদ্ধারের বিষয়টি আমার জানা নেই। তবে আপনি যেহেতু বলেছেন বিষয়টি খতিয়ে দেখা হবে।