স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাশরুম ডা. মো. বজলুল করিম চৌধুরী

স্বাস্থ্য সুরক্ষায় মাশরুমআমাদের দেশে খাদ্য তালিকায় সদ্য সংযোজিত একটি নাম “মাশরুম”।ইদানিং সারা বছরই নানা বর্ণ, নানা গন্ধ এবং নানা স্বাদের কোনো না কোনো মাশরুম এদেশে চাষ হতে দেখা যায়। বিভিন্ন জাতের মাশরুম চাষ হলেও একমাত্র ঋষি মাশরুম ছাড়া বাকি প্রায় সবগুলোই খাবার মাশরুম বা Edible Mushroom ঋষি মাশরুমটি খাবার হিসেবে ব্যবহার করা যায় না, এটি ব্যবহৃত হয় ঔষধ শিল্পে বিভিন্ন রোগ নিরাময়ের উপাদান হিসেবে।
খাবার মাশরুমগুলো আমাদের রসনা তৃপ্তি এবং খাদ্যপ্রাণ যোগিয়ে থাকে। শুধু তাই নয়, এদেরও রয়েছে রোগ নিরাময় কিংবা প্রতিরোধি নানাবিধ চমৎকার গুণাগুণ। জাতভেদে এরা বিভিন্ন ধরনের রোগের প্রতিষেধক হিসেবে কাজ করে। ওয়েস্টার মাশরুমের বেশ ক’টি জাত আমাদের দেশের জলবায়ুতে সারা বছরই চাষ হচ্ছে। এটি খেতেও যেমন সুস্বাধু তেমনি এর রয়েছে ডায়াবেটিস, হৃদরোগ, ব্রেইনস্ট্রোকসহ নানাবিধ রোগ প্রতিরোধক ক্ষমতা।
খাদ্যগুণ বিশ্লেষণে দেখা যায় মাশরুম উচ্চ মাত্রার প্রোটিন সমৃদ্ধ একটি খাবার। শুধু তাই নয় এই প্রোটিনের গুণ এবং মান শুধুমাত্র প্রাণিজ প্রোটিনের সাথেই তুলনীয়, কারণ অনেকেরই জানা যে প্রাণিজ প্রোটিনই উচ্চ মানসম্পন্ন প্রোটিন যা অত্যাবশ্যকীয় এমাইনো এসিডে সমৃদ্ধ এবং সেগুলো উদ্ভিদজাত প্রোটিনে পাওয়া সম্ভব নয়। কিন্তু মাশরুম প্রোটিনে রয়েছে সবগুলো অত্যাবশ্যকীয় বা essential এমাইনো এসিড। প্রাণিজ প্রোটিন আহরণ করতে গিয়ে তার সাথে দেহের জন্য ক্ষতিকর কোলেস্টেরল কিংবা চর্বি আহরণ করতে হয়, অথচ মাশরুম থেকে সেই একই মানের প্রোটিন আহরণ করা যায় কোনো ক্ষতিকর চর্বি গ্রহণ ব্যতিরেকেই। পরিমাণগত দিক বিবেচনায় দেখা যায় জাত ভেদে শুকনা মাশরুমে রয়েছে ২৫-৪০ ভাগ প্রোটিন যা মাছ কিংবা মাংস থেকে কম তো নয়ই বরং কোনো কোনো মাশরুমে তার পরিমাণ অনেক বেশি।
মাশরুমে খাবারের প্রয়োজনীয় ৭টি উপাদানই আমাদের দেহের চাহিদা অনুযায়ী বিদ্যমান। এতে কার্বোহাইড্রেট এবং ফ্যাটের পরিমাণ কম এবং প্রোটিন বেশি থাকায় প্রয়োজনীয় শক্তি জোগানোর পাশাপাশি শরীর গঠন, ক্ষয়পূরণ, বৃদ্ধিসাধন এবং ইমিউন সিস্টেমকে সবল রাখতে কার্যকর ভূমিকা রাখে। প্রায় সব মাশরুমই আয়রন, আয়োডিন, সোডিয়াম, পটাসিয়াম, জিংক, ফসফরাস, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেসিয়াম, সেলোনিয়ামসহ প্রায় সবগুলো প্রয়োজনীয় খনিজ উপাদানে সমৃদ্ধ। তাছাড়া আমাদের উপযোগী প্রায় সবগুলো ভিটামিন রয়েছে মাশরুমে, রয়েছে অতি প্রয়োজনীয় ভিটামিন ডি-৩, যা উদ্ভিদজাত খাবারে সচরাচর দেখা যায় না। মাশরুমে রয়েছে উন্নত মানের আঁশ, যা রক্তের গ্লুকোজ ও কোলেস্টেরল নিয়ন্ত্রণসহ কোষ্ঠকাঠিন্য, অন্ত্রের নানাবিধ প্রদাহ, এমনকি প্রাণঘাতি ক্যান্সার নিরাময়েও ভূমিকা রাখতে সক্ষম। এছাড়াও খাদ্যগুণের পাশাপাশি মাশরুমে রয়েছে নানাবিধ ঔষধি উপাদান, যা বিভিন্ন ধরনের রোগ-ব্যাধি প্রতিরোধ কিংবা প্রতিকারে ব্যাপক ভূমিকা রাখতে সক্ষম।
এটা এখন প্রমাণিত যে, হৃদরোগ, উচ্চ রক্তচাপ, ডায়াবেটিস, স্ট্রোক ইত্যাদি রোগ নিরাময়ে মাশরুম ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে কিছু মাশরুম ক্যান্সার রোগ নিরাময়েও কার্যকর। তাছাড় নানা ধরনের জীবাণু ঘটিত রোগ নিরাময়ে কোনো কোনো মাশরুম ব্যাপক ভূমিকা রাখে। ইতোমধ্যে আমরা জেনেছি এইডস আক্রান্ত অধিকাংশেরই মৃত্যুর কারণ বিভিন্ন ধরনের Opportunistic Infaction এবং ক্যান্সার। সুতরাং এ সমস্ত Opportunistic Infaction নিরাময়ের মাধ্যমে মাশরুম এইডস রোগের বিরুদ্ধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, এটাই স্বাভাবিক। আমরা জানি মাশরুমে রয়েছে জানা-অজানা জৈব-অজৈব অনেক রাসায়নিক পদার্থ ও খাদ্যমান। তাই অতি সহজেই এইডস রোগীদের জন্য রোগ নিরাময়ক আদর্শ খাবার হতে পারে মাশরুম। এই বিবেচনায় দীর্ঘদিন যাবৎ বিশ্বের নানা দেশে এইডস নিরাময়ে মাশরুমের ব্যবহার প্রচলিত। গবেষণায় দেখা গেছে মাশরুমে রয়েছে সেলেনিয়াম, যা এইডসের বিরুদ্ধে ভূমিকা রাখে।
“ভিটামিন এ” সমৃদ্ধ মাশরুম শিশুদের মৃত্যু হার কমানো এবং তাদের দৈহিক গঠনের জন্য কার্যকর। তাই অজস্র Micronutrientসমৃদ্ধ মাশরুম এইডস আক্রান্ত বয়স্কদের জন্যও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কর্তৃক অনুমোদিত একটি খাবার।
সম্প্রতি বিশ্বের দ্বিতীয় জনপ্রিয় ‘শীতাকে মাশরুম’-এর উপর ব্যাপক গবেষণায় দেখাগেছে এইডস চিকিৎসায় মাশরুমটির ভূমিকা অপরিসীম। ‘শীতাকে মাশরুম’-এ রয়েছে Lentinan নামের একটি রাসায়নিক উপাদান। এই Lentinan Ges Lentinula edodes Mycelium (LEM) নির্যাস, টিউমার নিরাময়ে কার্যকর। শুধু তাই নয় এ দু’টি উপাদান শরীরের Immune system কে উজ্জিবিত করতে ব্যাপক ভূমিকা রাখে। তাই শীতাকে মাশরুম নিয়মিত খেলে শুধু যে টিউমারই নিরাময় হবে তা নয়, এই মাশরুম AIDS রোগের বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম। আবার সুস্থ লোকের খাবার টেবিলে নিয়মিত ‘শীতাকে মাশরুম’-এর উপস্থিতি তাদের Immune system কে সতেজ রেখে AIDS আক্রান্ত হবার সম্ভাবনাকেও অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। ‘শীতাকে মাশরুম’-এর আরও একটি দিক নিশ্চিত যে এর Lentinan শরীরের Natural killer কোষগুলোকে উজ্জিবিত করে, যার অর্থ দাঁড়ায় নিয়মিত এই মাশরুম সেবনে শুধু মা-ই নয় HIV ঝুঁকিতে থাকা তার গর্ভস্থ শিশুও AIDS সংক্রামন থেকে নিরাপদ থাকতে সক্ষম। তাছাড়া Lentinan এবং LEM উভয়েরই রয়েছে সরাসরি HIV এর Replication প্রতিরোধক ক্ষমতা, ফলে এরা শরীরে ক্রমবর্ধমান ভাইরাসের সংখ্যা সীমিত রেখে HIV এবং AIDS নিরাময় করে।
আমরা দেখেছি মাশরুম জৈব-অজৈব অসংখ্য উপকারী রাসায়নিক উপাদানে সমৃদ্ধ একটি খাবার। সুতরাং মাশরুম সেবন দেহের ওহভষধসসধঃরড়হ প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে এটাই স্বাভাবিক। গবেষণায় দেখা গেছে মাশরুমে অবস্থানরত কাইটিন (Chitin) উপাদানটি সাধারণ Inflammation যেমন- পোকায় কামড়ানো এবং অল্প-স্বল্প পোড়াক্ষত সারাতে কার্যকর। এছাড়াও ওয়েস্টার মাশরুমে অবস্থানরত কিছু Myochemicals যেমন- Flavonoids, Phenolics এবং Polysaccharides ইনফ্লামেশনে এর ওপর কার্যকর ভূমিকা রাখে। এরা Inflammation তরান্বিত কারক কিছু উপাদান যেমন Tumor Necrosis Factor-á(TNF-á), Interleukin 6 (IL-6), Prostaglandin E2 (PGE-2), Nitric Oxide (NO) Ges Interferon-y (INF-y)- র নিঃসরনকে বাড়িয়ে দিয়ে উক্ত কাজগুলো সম্পাদন করে।
গবেষণায় আরও দেখা গেছে সাদা বাটন, শীতাকে ও মাইতাকে মাশরুম বিভিন্ন ধরনের Inflammation উদ্দিপক Adhesion Molecule এর কার্যকারিতা কমিয়ে Inflammation বিরোধি ভূমিকা রাখে। পর্যবেক্ষণে আরও জানা গেছে এশিয়ার বিভিন্ন দেশে অমরত্বের মাশরুম (Mushroom of immortalitay) বলে খ্যাত ঋষি মাশরুমের নানাবিধ উপাদান টিউমার নিরোধক (Anti Tumor), Inflammation বিরোধি (Anti- inflammaroty), বয়ঃবৃদ্ধি রোধক, (Anti-aging) এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বর্ধক (Immunomodulatory) গুণ রয়েছে। এছাড়াও এই মাশরুম মানব দেহে হারপিজ ভাইরাস, ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস এবং এইচআইভি’র বিরুদ্ধে অত্যন্ত কার্যকর। ঋষি মাশরুমে রয়েছে গ্যানোডারিক এসিড (Ganoderic acid) যা লিভারসহ অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গসমূহকে ক্ষতিকর রেডিয়েশন থেকে রক্ষা করতে সক্ষম। তাছাড়াও সম্প্রতি বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে নানা ধরনের তাজা মাশরুম কিংবা তাদের নির্যাস Inflammation বিরোধি কাজ করে মূলতঃ তাদের মধ্যে অবস্থানরত Polysaccharides, â-Gulcan এর কারণে।
পৃথিবীর নানা দেশে গবেষণায় দেখা গেছে Chronic inflammation তথা Granuloma-র উপর মাশরুমের কার্যকারিতা অনেক এবং প্রায় সব মাশরুমেরই এ গুণ রয়েছে। এতকিছুর পরেও মাশরুমকে কোনোক্রমেই ঔষধ বলা যাবে না। সামগ্রিক বিবেচনায় একে একটি উচ্চমানের ঔষধি গুণ সম্পন্ন খাবার বলা সম্ভব, যা নিয়মিত গ্রহণে অনেক ধরনের রোগবালাই থেকে মুক্ত রেখে আমাদের স্বাস্থ্য সুরক্ষা করতে সক্ষম।
লেখক: ডা. মো. বজলুল করিম চৌধুরী, এমবিবিএস, এমফিল, পিএইচ ডি; সহযোগী অধ্যাপক, ফরিদপুর মেডিক্যাল কলেজ।

Leave a Reply