আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া আর হবে না

আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া আর হবে না

বৈশ্বিক মহামারি পরবর্তী বিশ্বে আর আগের অবস্থায় ফিরে যাওয়া হবে না। অবকাঠামো, কর্মসংস্থান ও সামাজিক সুরক্ষার নতুন সব বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে কভিড-১৯ সঙ্কট। বিশ্বব্যাপী সামাজিক ও অর্থনৈতিক পরিবর্তনকে অন্যান্য সময়ের চেয়ে অনেক দ্রুত ত্বরান্বিত করেছে কভিড-১৯ বৈশ্বিক মহামারি।

নরওয়েভিত্তিক বহুজাতিক টেলিযোগাযোগ কম্পানি ও বাংলাদেশের শীর্ষস্থানীয় মোবাইল ফোন অপারেটর গ্রামীণফোনের মূল অংশীদার টেলিনর তাদের এক গবেষণায় নতুন তিনটি পূর্বাভাস তুলে ধরে হয়েছে যা ভূমিকা রাখবে আমাদের নতুন বিশ্ব গঠনের। আজ বুধবার এই গবেষণা প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়।

এ বিষয়ে টেলিনর রিসার্চের ভাইস প্রেসিডেন্ট গর্ম আন্দ্রিয়াস গিরননেভেত বলেন, ‘এই বৈশ্বিক মহামারি আমাদের দেখিয়েছে সকল উদ্ভাবনের মূলেই রয়েছে প্রয়োজনীয়তা। এটা স্পষ্ট যে, আমরা যেভাবে আমাদের শহর, প্রতিষ্ঠান ও সমাজ পরিচালনা করি সেখানে ব্যাপক পরিবর্তন আসবে। পেন্ডুলামের কাটা এখন পরিবর্তনের দিকে।’

টেলিনরের গবেষণা দলের তথ্যে যে গুরুত্বপূর্ণ তিনটি পূর্বাভাস উঠে এসেছে তা হচ্ছে- ১. নতুন অবকাঠামো নতুনভাবে কাজের প্রক্রিয়াকে ত্বরান্বিত করবে। যারা এতদিন অফিসে বসে কাজ করতেন, এই বৈশ্বিক মহামারির কারণে তারা বাসা থেকেই কাজ করছেন। এই বিষয়টি মানুষকে নতুন সম্ভাবনার ভাবাচ্ছে যে, প্রথাগত অফিস অতোটা প্রয়োজনীয় নয়। অনেকেই দূরবর্তী স্থান থেকে কাজ করার বিষয়টির সঙ্গে নিজেদের মানিয়ে নিতে শুরু করেছেন। বাড়ি থেকে কিংবা কাজের পরিবেশ বজায় রেখে বাড়ির নিকটবর্তী দূরত্ব থেকে কাজ করছেন। এ পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে বৈশ্বিক মহামারি। বাড়ি কিংবা নিরপেক্ষ কর্মপরিবেশ থেকে কাজ করার ক্ষেত্রে কর্মীদের সংখ্যা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সরকার আরো বেশি ডিজিটাল এবং যোগাযোগ অবকাঠামোর উন্নয়নের মাধ্যমে শহরগুলোকে কীভাবে সংগঠিত করা যায় তা নতুন করে চিন্তা-ভাবনা শুরু করবে।

এক্ষেত্রে নতুন কাজের ক্ষেত্র কর্মীদের শহরের নানা প্রান্তে এবং আবাসিক এলাকার কাছাকাছি থাকতে সহায়তা করবে, যা যাতায়াতের সময় বাঁচাবে। যাতায়াতের পরিমাণ কমলে সময় বাঁচবে এবং এর ফলে রাস্তায় ট্রাফিকও কমে যাবে; যা দূষণের পরিমাণ কমাতে, বায়ু ও জনস্বাস্থ্যের মান উন্নয়নে এবং উৎপাদনশীলতা ও দক্ষতা বৃদ্ধিতে সহায়তা করবে। সর্বোপরি, বৈশ্বিক মহামারি পরবর্তী সময়ে শহরগুলোতে প্রথাগত অফিস কম দেখা যাবে। এর বিপরীতে নতুন কাজের ক্ষেত্র বাড়বে। ফলে শহর হবে পরিবেশবান্ধব এবং পথচারীদের চলাচলে সহায়ক।

২. করোনাভাইরাসের কারণে লকডাউনের প্রভাব গিয়ে পড়েছে অর্থনীতির ওপর। ইতিমধ্যেই, কভিডের কারণে চাকরির বাজার সঙ্কুচিত হলেও মহামারির কারণে উদ্ভূত চাহিদা এবং অভিবাসন সম্পর্কিত নতুন সীমাবদ্ধতার কারণে আমরা নতুন ধরনের চাকরির সম্ভাবনাও দেখছি। চাকরি হারানো কর্মী ও নতুন মানবসম্পদের চাহিদা পূরণের ক্ষেত্রে প্রথাগত পদ্ধতিতে নিয়োগ বেশ দীর্ঘসময় নেবে এবং এক্ষেত্রে দক্ষতারও যুগোপযোগী পরিবর্তন প্রয়োজন। আমাদের অনুমান কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) আরো কার্যকরী উপায়ে কর্মী নিয়োগের বিষয়ের ক্ষেত্রে রূপান্তর ঘটাবে।

নিয়োগকর্তা ও সম্ভাব্য প্রার্থীদের তথ্যগুলো বিশ্লেষণ করে অ্যালগরিদম স্বয়ংক্রিয়ভাবে যাচাই-বাছাই করে অনুপযুক্ত প্রার্থীকে বাদ দেবে এবং উপযুক্ত প্রার্থীকে নিয়োকর্তার সঙ্গে সংযুক্ত করবে। এআই’র দ্রুত ও নির্ভুল প্রক্রিয়ায় শুধুমাত্র চাকরি প্রত্যাশী ও নিয়োগকর্তার অর্থ ও সময়ই বাঁচাবে না, পাশাপাশি সঠিক কর্মী ও নিয়োগকর্তার যোগাযোগ বৃদ্ধির মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানে উপযুক্ত কর্মী হারানো সম্ভাবনা কমিয়ে আনবে।

৩. সংক্রামক রোগ প্রসারের বিরুদ্ধে লড়াই করার ক্ষেত্রে ডাটা ক্রমান্বয়েই গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার হয়ে উঠছে। জরুরি জনস্বাস্থ্যের পরিস্থিতিতে দায়িত্বশীল উপায়ে এবং বেনামে টেলকো ডাটা ব্যবহার করা হতে পারে। এর আগে বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানে ডেঙ্গু ও ম্যালেরিয়া বিস্তারের পূর্বাভাস নিয়ে টেলিনরের গবেষণা প্রমাণ করে যে, অজ্ঞাতভাবে সংগ্রহ করা নেটওয়ার্কের তথ্য রোগ বিস্তার মডেলের নির্ভুল হওয়ার সম্ভাবনা বাড়িয়ে তোলে। পাশাপাশি, সরকার ও স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষকে প্রতিরোধ পদক্ষেপ গ্রহণে এবং ত্রাণ প্রচেষ্টা জোরদারে লক্ষ্য নির্ধারণে সহায়তা করে। এক্ষেত্রে, যারা সরকার এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরদারি নিয়ে চিন্তিত তাদের নিশ্চিত করা হবে যে, অবস্থানগত তথ্য শুধুমাত্র মানুষের গতিবিধি সম্পর্কে সামগ্রিক ধারণা দেয় এবং দলীয়ভাবে এ তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

গতিবিধি বিশ্লেষণ রোগ পূর্বাভাসের চেয়েও বেশি তথ্য প্রদানের সম্ভাবনা রয়েছে। এ তথ্য স্মার্ট সিটি পরিকল্পনা, পরিবেশগত বিশ্লেষণে সহায়তাসহ শিল্পখাত- যেমন ভ্রমণ খাতের প্রবৃদ্ধিতে সহায়তা করতে পারে। এক্ষেত্রে সম্ভাবনা অসীম।

এ বিষয়ে গর্ম আন্দ্রিয়াস গিরননেভেত বলেন, ‘কভিড-১৯ এর বৈশ্বিক মহামারি আমাদের সবাইকে প্রচলিত ধারণার বাইরে ভাবতে সহায়তা করছে। পাশাপাশি আমাদের কাজ এবং আমরা গ্রাহকদের যে সেবা দিই ও সমাজে যে ভূমিকা রাখি সেক্ষেত্রে পরিবর্তনকে ত্বরান্বিত করছে। আমাদের সামাজিক ও অর্থনৈতিক আচরণে পরিবর্তন আসবে। তাই সরকার ও নেতৃবৃন্দের জন্য এখনই সময় নতুন করে ভাববার। যেহেতু আমরা করোনাভাইরাস পরবর্তী ভবিষ্যতের দিকে আগাচ্ছি, এক্ষেত্রে মূল্যায়ন করতে হবে কি বন্ধ করা উচিৎ, কি শুরু করা উচিৎ এবং কোন বিষয়গুলো ত্বরান্বিত করা প্রয়োজন।’

Leave a Reply