করোনার প্রভাব: বাংলাদেশে কয়েকটি বহুজাতিকে বাসায় থেকে কাজ

করোনার প্রভাব: বাংলাদেশে কয়েকটি বহুজাতিকে বাসায় থেকে কাজ

কর্মীদের করোনাভাইরাসের সংক্রমণ থেকে সুরক্ষিত রাখতে বাসায় বসে কাজ করার নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশে কর্মরত কয়েকটি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান। এ তালিকায় রয়েছে মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন, রবি, বাংলালিংক ও নিত্যব্যবহার্য পণ্যের বিক্রেতা ইউনিলিভারের মতো প্রতিষ্ঠান।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে যারা ‘অফিস ফ্রম হোম’ বা বাসায় থেকে কাজ করার বিষয়টি চালু করেনি, তারাও করোনাভাইরাস ঠেকাতে বাড়তি প্রস্তুতি ও সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়েছে। যেমন কেউ কেউ পালা করে কার্যালয়ে এসে কাজ করার ব্যবস্থা চালু করেছে, যাতে জনসমাগম কম হয়। কেউ কেউ আপাতত কার্যালয়ে অতিথিদের প্রবেশ নিষিদ্ধ করেছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান সরবরাহকারী ও ক্রেতাদের সঙ্গে এখন অনলাইন ও ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে যোগাযোগ করছে।

সব মিলিয়ে করোনাভাইরাসের কারণে দেশের করপোরেট খাতের কার্যক্রমে নতুন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। তারা বলছে, এতে পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহে কোনো সমস্যা হবে না। কারণ, কেউই উৎপাদন বন্ধ বা সীমিত করার পদক্ষেপ নেয়নি। বিক্রি ও সরবরাহ ব্যবস্থাও সচল রাখা হয়েছে।

করোনাভাইরাস থেকে সুরক্ষা নিশ্চিতে কী কী পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তা জানতে গতকাল ১৫টি বহুজাতিক ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান, উন্নয়ন–সহযোগী ও বেসরকারি বিদেশি সংস্থার প্রতিনিধির সঙ্গে প্রথম আলোর কথা হয়। এর মধ্যে কয়েকটি প্রতিষ্ঠান বিষয়টি নিয়ে আনুষ্ঠানিক বক্তব্য দিয়েছে।

জানতে চাইলে দেশের সবচেয়ে বড় মোবাইল অপারেটর গ্রামীণফোন কর্তৃপক্ষ এক বিবৃতিতে জানিয়েছে, করোনার পরিপ্রেক্ষিতে তারা নিরাপত্তার পাশাপাশি মোবাইল সেবা চালু রাখতে একটি পরিকল্পনা নিয়েছে। এর অংশ হিসেবে যেসব কর্মী সরাসরি গ্রাহকসেবার সঙ্গে যুক্ত নন, তাঁদের বাসায় থেকে কাজ করতে উৎসাহিত করা হচ্ছে। আর যাঁরা সরাসরি গ্রাহকদের সেবা দেবেন, তাঁদের যথাযথ নিরাপত্তাব্যবস্থা নিতে বলা হয়েছে।

গ্রামীণফোনের হেড অব এক্সটার্নাল কমিউনিকেশনস মুহাম্মদ হাসান বলেন, গ্রামীণফোন ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে গ্রাহক সেবা নিশ্চিত করার ওপর জোর দিচ্ছে, যেন সরাসরি যোগাযোগ যথাসম্ভব এড়িয়ে চলা যায়। কর্তৃপক্ষ সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করে পরবর্তী নির্দেশনা দেবে।

১৬টি বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ও সংস্থার সঙ্গে কথা বলেছে প্রথম আলো। তারা নানা ধরনের সুরক্ষা ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে।

মোবাইল অপারেটর রবি আজিয়াটা ও বাংলালিংক কর্মীদের বাসায় থেকে কাজ করার নিয়ম চালু করেছে। রবির হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স সাহেদ আলম জানান, তারা আগে থেকেই কর্মীদের ‘হোম অফিস’ সুবিধা দিয়ে আসছে। এখন সেটা আরও উৎসাহিত করছে। এদিকে বাংলালিংক জানিয়েছে, তারা কাল বুধবার থেকে দুই সপ্তাহের জন্য বেশির ভাগ কর্মীকে বাসায় বসে কাজ করতে বলেছে।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানগুলো অনেকটা তাদের মূল কার্যালয়ের সঙ্গে মিলিয়ে এসব পদক্ষেপ নিয়েছে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) হিসাবে গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত করোনা ছড়িয়েছে ১৫৮টি দেশে। আক্রান্তের মোট সংখ্যা ১ লাখ ৭৩ হাজার ১১১ জন। মারা গেছে ৬ হাজার ৬৬৪ জন। এর আগে সংস্থাটি গত ১২ মার্চ করোনাভাইরাসকে (কোভিড-১৯) মহামারি হিসেবে ঘোষণা করে।

বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ইউনিলিভার বিশ্বব্যাপী তাদের কর্মীদের করোনার বিষয়ে নির্দেশনা দেয় গত শুক্রবার। এতে কী কী করতে হবে, কী কী করা থেকে বিরত থাকতে হবে, তা বলে দেওয়া হয়। যাঁরা কার্যালয়ে কাজ করেন তাঁদের বাড়িতে থেকে কাজের নির্দেশ দেওয়া হয়। বাংলাদেশেও ইউনিলিভার একই নীতি অনুসরণ করছে।

ইউনিলিভার বাংলাদেশের হেড অব করপোরেট অ্যাফেয়ার্স, পার্টনারশিপ অ্যান্ড কমিউনিকেশনস শামীমা আক্তার বলেন, ‘গত পরশু থেকে (শনিবার) আমরা বাসায় থেকে কাজ করা শুরু করেছি। এতে উৎপাদন ও সরবরাহ ব্যাহত হবে না। বাড়তি সুরক্ষা ব্যবস্থা নিয়ে কারখানা চালু রাখা হয়েছে।’

বাটা শু কোম্পানি (বাংলাদেশ) লিমিটেডের কোম্পানি সচিব হাশিম রেজা বলেন, ‘আমরা কারখানা ও কার্যালয়ে অতিথিদের আগমন আপাতত পুরোপুরি বন্ধ রেখেছি। সরবরাহকারীদের অনলাইনে ভিডিও কনফারেন্সে কথা বলতে বলা হয়েছে। এ ছাড়া কর্মীদের আঙুলের ছাপে হাজিরা দেওয়ার বাধ্যতামূলক নিয়মটি বাতিল করা হয়েছে।’

ব্রিটিশ আমেরিকান টোব্যাকো বাংলাদেশের সিনিয়র করপোরেট অ্যাফেয়ার্স ম্যানেজার আনোয়ারুল আমিন বলেন, ‘বাসায় থেকে কাজ করার মতো কোনো নির্দেশনা আমরা এখনো পাইনি। আমরা পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছি। সে অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

মার্কস অ্যান্ড স্পেনসারের ঢাকা কার্যালয় জানায়, তারা কর্মীদের পালা করে ঐচ্ছিকভাবে বাসায় থেকে অফিস করার সুযোগ দিয়েছে। এতে তাদের কার্যক্রম স্বাভাবিক আছে।

বাংলাদেশে কতগুলো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠান ব্যবসা করে, তার তাৎক্ষণিক কোনো হিসাব পাওয়া যায়নি। তবে এ দেশে কর্মরত বিদেশি বিনিয়োগকারীদের সংগঠন ফরেন ইনভেস্টরস চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির (এফআইসিসিআই) সদস্যসংখ্যা ১৮৮। অবশ্য বিনিয়োগকারীর সংখ্যা আরও অনেক বেশি। যেমন জাপান এক্সটার্নাল ট্রেড অর্গানাইজেশনের (জেট্রো) হিসাবে, এখন এ দেশে কাজ করা জাপানি কোম্পানিই ৩১০টি। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে গত মাসে জানায়, বাংলাদেশে অন্তত ৪৪টি দেশের প্রায় আড়াই লাখ বিদেশি নাগরিক কাজ করেন। ২০১৮ সালের এপ্রিল থেকে ২০১৯ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত সময়কালের তথ্য নিয়ে এ গবেষণা চালানো হয়।

জানতে চাইলে ফরেন চেম্বারের সভাপতি রূপালী চৌধুরী বলেন, ‘আমরা করোনার ঝুঁকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় পরিকল্পনা ও প্রস্তুতি নিয়েছি। কর্মীদের বলা হচ্ছে, কারও সামান্য কোনো সমস্যা হলেও বাসায় থাকতে। কোনো জোর নেই। আমরা উৎপাদন বা সরবরাহ বন্ধ করছি না।’

এদিকে দেশীয় বেসরকারি কিছু প্রতিষ্ঠানের সঙ্গেও কাজের বিষয়ে গতকাল আলাপ হয়। তারা সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেও বাসায় থেকে কাজ করানোর মতো কোনো পদক্ষেপের কথা এখনো ভাবছে না বলে জানা গেছে।

উন্নয়ন–সহযোগীরাও সতর্ক

এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (এডিবি) ঢাকা কার্যালয়ের কর্মীরা গতকাল পরীক্ষামূলকভাবে বাসায় অবস্থান করে অফিসের কাজকর্ম সেরেছেন। কর্মীরা অনলাইনে তাৎক্ষণিকভাবে পরস্পরের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন।

এডিবির ঢাকা কার্যালয়ের বহিঃসম্পর্ক বিভাগের প্রধান গোবিন্দ বর প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা পরীক্ষামূলকভাবে এক দিন বাসায় থেকে কাজ করেছি। এভাবে দৈনন্দিন কাজ কতটা সম্পন্ন করা সম্ভব, তা জানতেই উদ্যোগটি নেওয়া হয়েছে। করোনার প্রাদুর্ভাবের মাত্রা বুঝে পরবর্তী সময়ে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।’

এদিকে বিশ্বব্যাংকের বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার সব দেশের কার্যালয়ের কর্মীরা গত সপ্তাহে এক দিন বাসায় থেকে কাজ করেন। এতে অংশ নেন ৫৩০ জন কর্মী।

ভলান্টিয়ার সার্ভিসেস ওভারসিজ (ভিএসও) নামের একটি বহুজাতিক বেসরকারি সংস্থাও ‘রোটেশন’ ব্যবস্থা চালু করেছে। তাদের কর্মীরা পালা করে কার্যালয়ে যাচ্ছেন, যাতে সমাগম কম হয়।

Leave a Reply