প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের কয়েকটি ধারা-উপধারা সংশোধনের দাবি প্রকাশকদের

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইনের কয়েকটি ধারা-উপধারা সংশোধনের দাবি প্রকাশকদের

বাংলাদেশে কোনও ‘নোট গাইড’ বই নেই বলে দাবি করেছে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি। সংগঠনটির সহ-সভাপতি কামরুল হাসান শায়ক বলেন, “বাজারে ‘নোট গাইড’ বইয়ের কোনও অস্তিত্ব নেই। অনুশীলনমূলক বইকে নোট গাইডের তকমা দিয়ে বিক্রি বন্ধ করার প্রস্তাব করা হয়েছে আইনে। এই বিধিনিষেধ আরোপের যে প্রস্তাব’ তা শিক্ষাখাত তথা জাতির বৃহত্তর স্বার্থে পুনর্বিবেচনার দাবি রাখে। তা না হলে পুরো শিল্প ধ্বংসের মুখে পড়বে।”

শনিবার (২২ ফেব্রুয়ারি) দুপুরে ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি এসব কথা বলেন। প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০১৯ -এর কয়েকটি ধারা-উপধারা সংশোধনের দাবিতে সংবাদ সম্মেলনে আয়োজন করে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতিসহ ১২টি সংগঠন। আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি সোমবার সারা দেশের বইয়ের দোকান বন্ধ রেখে মানববন্ধন করবে বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতি।

আইনে অনুশীলন বইয়ের সংজ্ঞা ঠিক করার দাবি করে জনাব শায়ক বলেন, ‘আইনে অনুশীলন বইয়ের সংজ্ঞায়িত করতে হবে। অনুশীলন বইয়ের মানোন্নয়ন এবং অনিয়ম নিয়ন্ত্রণের জন্য মনিটরিং সেল গঠন করা যেতে পারে।’

শায়ক দাবি করে বলেন, অনুশীলন বই বন্ধ হয়ে গেলে শিক্ষার্থীরা পুরোপুরি কোচিং সেন্টার ও গৃহশিক্ষকের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। এছাড়া অনুশীলন বইয়ের খাতে বিশাল যে জনগোষ্ঠী কর্মরত আছেন, তারা বেকার ও অর্ধবেকার হয়ে পড়বেন। ২৩ লাখ ১০ হাজার মানুষের জীবন-জীবিকা হুমকির মুখে পড়বে।’

লিখিত বক্তব্যে সংগঠনের সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন বলেন, “প্রস্তাবিত আইনে নোট গাইড’ সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে কিন্তু অনুশীলনমূলক বইয়ের কোনও সংজ্ঞা নেই। ‘নোট গাইড’ হচ্ছে পাঠ্যবইয়ে দেওয়া উত্তরগুলো সরাসরি থাকে’ যা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রি করা হয়। শিক্ষার্থীরা তা মুখস্ত করে পরীক্ষায় অংশ নেয়। অন্যদিকে অনুশীলন বইয়ের বিষয় বস্তু হচ্ছে পাঠ্য বিষয়ের সহজে অনুধাবন, প্রশ্নের নমুনা, উন্নত উত্তর লেখন পদ্ধতি। শিক্ষার্থীরা অনুশীলন বই মুখস্ত করে না। কারণ তা মুখস্ত করে কোনও লাভ নেই। সৃজনশীল পদ্ধতিতে পরীক্ষায় কোনও প্রশ্ন কমন পড়ে না।”

সংবাদ সম্মেলনে বিভিন্ন দেশের অনুশীলন বই উপস্থাপন করেন কামরুল হাসান শায়ক। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে অনুশীলন বইয়ের সহাতায় পাঠ্যপুস্তক বই প্রকাশিত হয় দাবি করে সংগঠনের সভাপতি আরিফ হোসেন বলেন, ‘বিশ্বের বিভিন্ন দেশে একেক রকম সহায়ক বা অনুশীলন বই রয়েছে। সিঙ্গাপুরে শুধুমাত্র অনুশীলন বই দিয়েই চলে লেখাপড়া।’

নোট বই থেকে পরীক্ষায় প্রশ্নপত্র কমন পড়েছে সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সংগঠনের সহ-সভাপতি শ্যামল পাল বলেন, ‘কোনও অনুশীলন বই থেকে প্রশ্ন কমন পড়েনি। এটা বিগত বছরের প্রশ্ন থেকে এই বছরের প্রশ্ন করা হয়েছে। এই জন্য আমরা দায়ি নই। যারা প্রশ্নের প্রণেতা তারাই দায়ি।’

বক্তরা প্রস্তাবিত শিক্ষাআইন ২০১৯-এ সংশোধন ও সংযোজনের সুস্পষ্ট দাবি উত্থাপন করেন। দাবিটি নিম্নরূপ—

পরিমার্জিত শিক্ষা আইন-২০১৯ এর খসড়া
২(১১) “নোট ও গাইড বই” অর্থ যে পুস্তকসমূহে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর আলোকে বিভিন্ন পরীক্ষার সম্ভাব্য প্রশ্নাবলি উত্তর লিপিবদ্ধ থাকে, যাহা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয় করা হয়।
১৬(১) কোন ধরনের নোট বই বা গাইড বই মুদ্রণ, বাধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাইবে না।
১৬(২) উপ-ধারা (১) এর বিধানের লংঘন করিয়া কেহ কোনো কার্য করিলে তিনি অনুর্ধ্ব তিন বত্সর কারাদণ্ড বা অনুর্ধ্ব পাচ লক্ষ টাকা অর্থ বা উভয় দণ্ডনীয় হবেন।
১৬(৩) কোন শিক্ষা প্রতিষ্ঠান বা শিক্ষক শিক্ষার্থীদের নোট বই, গাইড বই ক্রয় বা পাঠে বাধ্য করিলে বা উত্সাহ প্রদান করিলে উহা অসাদাচরণ হিসেবে গণ্য হবে, এবং সংশ্লিষ্ট শিক্ষক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রধান, ব্যবস্থাপনা কমিটি বা পরিচালনা কমিটির সংশ্লিষ্ট সদস্যের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক এখতিয়ারে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করা যাইবে।

অন্তর্ভুক্ত করার দাবি
২(১১) ‘নোট-গাইড বই’ অর্থ যে পুস্তকসমূহে পাঠ্যপুস্তক বোর্ডের (NCTB) পাঠ্যপুস্তকে প্রদত্ত প্রশ্নাবলির উত্তর লিপিবদ্ধ থাকে, যাহা বাণিজ্যিকভাবে বিক্রয় করা হয়।
‘অনুশীলনমূলক বই’ অর্থ যে পুস্তকসমূহে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং পর্যাপ্ত নমুনা প্রশ্ন ও উত্তর কিংবা টেক্সট লিপিবদ্ধ থাকে, যাহার অনুশীলন শিক্ষার্থীদের জ্ঞান অর্জনে সহায়ক হয়।
১৬(১) কোন ধরনের নোট বই বা গাইড বই মুদ্রণ, বাঁধাই, প্রকাশ বা বাজারজাত করা যাইবে না। তবে যদি তা নোট-গাইড না হয়ে এমন হয় যাহা অনুশীলনের মাধ্যমে জ্ঞানের পরিধি বৃদ্ধি পায় অথবা যাহা শিক্ষা সহায়ক সাপ্লিমেন্টারি টেক্সট বই বা অনুশীলনীমূলক বই, তাহা প্রকাশ করা যাইবে।
উপ ধারা ১৬(৪) নতুন যুক্ত করতে হবে
জ্ঞান অর্জনে সহায়ক যে কোন অনুশীলনমূলক শিক্ষা উপকরণ বা বই-এর জন্য ২নং উপধারা প্রযোজ্য হইবে না।

অনুশীলনমূলক বই— বিক্রি বন্ধের জন্য ২০১৫ সালে হাইকোর্টের দেওয়া রুল এখনও নিষ্পতি হয়নি দাবি করে আইনজীবি পার্থ সারথি মন্ডল বলেন, “রিটের আদেশে বলা ছিল রুল নিষ্পতি না হওয়া পর্যন্ত ‘অনুশীলনমূলক সহায়ক বই’ বিক্রি অব্যাহত থাকবে। কিন্তু আইনপ্রয়োগকারী সংস্থা ও স্থানীয় প্রশাসন তা মানছেন না। তারা এটা নিয়ে ফায়দা নেওয়া চেষ্টা করছেও। যা আদালত অবমাননার শামিল।’’

প্রস্তাবিত শিক্ষা আইন-২০১৯ এর কয়েকটি ধারা-উপধারা সংশোধনের দাবিতে আগামী ২৪ ফেব্রুয়ারি সারাদেশে মানববন্ধন করবে সংগঠনগুলো। ওইদিন সারাদেশের বই বিক্রির দোকান বন্ধ রাখাও ঘোষণা দিয়েছেন সংগঠনের সভাপতি আরিফ হোসেন ছোটন।

সম্মেলনে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির সভাপতি মো. আরিফ হোসেন (ছোটন), সহ-সভাপতি শ্যামল পাল, সহ-সভাপতি কামরুল হাসান শায়ক, সহ-সভাপতি মির্জা আলী আশরাফ কাশেম, বাংলাদেশ পুস্তক প্রকাশক ও বিক্রেতা সমিতির রাজধানী কমিটির সভাপতি মাজহারুল ইসলাম, বাংলাদেশ ওয়েব প্রিন্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি রাব্বানি জাব্বার, বাংলাদেশ জ্ঞান ও সৃজনশীল প্রকাশক সমিতির সাবেক সভাপতি ওসমান গনি, বাংলাদেশ পুস্তক বাঁধাই ব্যবসায়ী সমিতির সভাপতি মো. আব্দুল্লাহ আল মাহমুদ।

Leave a Reply