দুদক খুঁজছে মুদ্রা পাচারকারী সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের

দুদক খুঁজছে মুদ্রা পাচারকারী সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের

পণ্য আমদানিতে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মুদ্রা পাচারে জড়িতদের নামের তালিকা তিন মাসের মধ্যে পাঠাতে বলেছে দুর্নীতি দমন কমিশন দুদক। পাশাপাশি গেল তিন বছরে বাণিজ্যের আড়ালে মুদ্রা পাচারে জড়িত ব্যাংক, সরকারি কর্মকর্তাদের তথ্যও চেয়েছে সংস্থাটি। গেল ২৮ ফেব্রুয়ারি দুদকের মহাপরিচালক আ ন ম আল ফিরোজ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনবিআর চেয়ারম্যানকে দেওয়া চিঠিতে এসব নামের তালিকা পাঠানোর অনুরোধ জানিয়েছেন। দুদকের দেওয়া চিঠির কপি অর্থ মন্ত্রণালয়েও পাঠানো হয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয় সূত্রে এ তথ্য জানা গেছে।

জানা যায়, নানা উপায়ে বাংলাদেশ থেকে মুদ্রা পাচার এখন নিয়মিত ঘটনা। বিশেষ করে শূন্য শুল্কের পণ্য আমদানি, মিথ্যা ঘোষণা, ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে দেশ থেকে টাকা পাচার করে বিদেশে বিলাসবহুল জীবনযাপন, বাড়ি-গাড়ি কেনার ঘটনা অহরহ। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক প্রতিষ্ঠান গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টিগ্রিটি বা জিএফআই রিপোর্ট অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের আড়ালে ২০০৫ থেকে ২০১৫ সালের মধ্যে ১১ বছরে দেশ থেকে পাচার হয়েছে প্রায় ছয় লাখ কোটি টাকা। এ নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ফিন্যানশিয়াল ইন্টেলিজেন্ট ইউনিট-বিএফআইইউ কাজ করছে। তারা দফায় দফায় মিটিং করছে, কার্যকর করণীয় ঠিক করার চেষ্টা করছে। তবে মুদ্রা পাচার রোধ বা সুইস ব্যাংকে থাকা লাখ লাখ কোটি টাকা ফেরাতে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ নিতে পারেনি।

এমন প্রেক্ষাপটে এনবিআরকে তথ্য চেয়ে চিঠি দিল দুদক। ওই চিঠিতে সংস্থাটি সরাসরি মুদ্রা পাচারে বিভিন্ন ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংকারদের জড়িত থাকার কথা উল্লেখ করে। এতে বলা হয়, দেশের কিছু অসাধু ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান কতিপয় সরকারি কর্মকর্তা ও ব্যাংকারের সহায়তায় পণ্য আমদানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মুদ্রা পাচার করছেন। এ ধরনের কর্মকাণ্ডের কোনো কোনো ক্ষেত্রে সরকারি কর্মকর্তারা সরাসরি অথবা পরোক্ষভাবে জড়িত থাকেন। বিভিন্ন সময়ে শুল্ক বিভাগ ওভার ইনভয়েসিংয়ের ঘটনা ধরার পর জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা, জরিমানা, লাইসেন্স বাতিলসহ বিভিন্ন শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিয়ে থাকে।

দুদক মনে করে, বেশির ভাগ মুদ্রা পাচার হয়ে থাকে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে ওভার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে। দুদক যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াশিংটনভিত্তিক সংস্থা গ্লোবাল ফিন্যানশিয়াল ইন্টেগ্রিটি-জিএআইয়ের তথ্য দিয়ে চিঠিতে উল্লেখ করে যে ২০১৫ সালে আমদানি-রপ্তানির আড়ালে বাংলাদেশ ৫৯২ কোটি ডলার বা ৫০ হাজার কোটি টাকা পাচার হয়। এসব অভিযোগের অধিকাংশই মিথ্যা ঘোষণায় পণ্য আমদানি ও অর্থপাচারসংক্রান্ত। দুদক থেকে এসব মুদ্রা পাচার ও জড়িতদের নামের তালিকা ও বিস্তারিত তথ্য চেয়ে এনবিআরকে একাধিকবার তাগাদা দিলেও সংস্থাটি কোনো সহায়তা করেনি সংস্থার চিঠিতে বলা হয়।

এ ব্যাপারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, এনবিআরের সাবেক সদস্য ও সেন্ট্রাল ইন্টেলিজেন্স সেল-সিআইসির সাবেক মহাপরিচালক ড. সৈয়দ আমিনুল করিম কালের কণ্ঠকে বলেন, এই ইস্যুতে সাধারণত এনবিআরের সিআইসি ও কাস্টমস ইন্টেলিজেন্ট শাখা কাজ করে। মূলত ওভার ও আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে মুদ্রা পাচার হয়ে থাকে। বন্দরে অত্যাধুনিক স্ক্যানার থাকলে পণ্যের মিথ্যা ঘোষণা ধরা সম্ভব। এক পণ্যের নামে অন্য পণ্য আমদানি ঠেকানো যায়। তা ছাড়া ট্রান্সফার প্রাইসিং নামে যে আইন করা হয়েছে, তার যথাযথ বাস্তবায়ন দরকার। সীমিত পরিসরে কাজ হলেও একে কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। বন্দরে অত্যাধুনিক স্ক্যানার বসাতে হবে। আর যাদের সন্দেহ করা হবে, তাদের আয়-ব্যয় খতিয়ে দেখা উচিত।

বিএফআইইউ পাচারের অর্থ ফেরাতে ভারত ও যুক্তরাষ্ট্র মডেলের সুপারিশ করেছিল। ওই মডেলের আলোকে ভারত পাচারের অর্থের ওপর জরিমানাসহ কর আদায়ে ১০টি দূতাবাসে এবং যুক্তরাষ্ট্র তাদের ২৪টি দূতাবাসে কর কর্মকর্তা নিয়োগ দিয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় ভারত সুইজারল্যান্ড থেকে জরিমানাসহ কর আদায় করেছে। সুইস ব্যাংকে দেশটির ৬৩৯ জন ভারতীয় নাগরিকের হিসাব পরিচালনাসংক্রান্ত তথ্য পাওয়ার পর জনৈক ব্যক্তি টাকা ফেরত আনতে সে দেশের আদালতে মামলা করে। মামলার রায়ে দেশটির কর বিভাগকে টাকা ফেরত আনার দায়িত্ব দিলে, তারা জরিমানাসহ কর আদায়ে সক্ষম হয়। এ ক্ষেত্রে ভারত ও সুইজারল্যান্ডের মধ্যে দ্বৈত কর পরিহার চুক্তির সহায়তা নেওয়া হয়। তবে এ ক্ষেত্রে পাচারকারীর তথ্য অন্য কোনো সংস্থাকে দেওয়া যাবে না এবং পাচারকারীর বিরুদ্ধে ফৌজদারি ব্যবস্থাও নেওয়া যাবে না। অবশ্য বিএফআইইউর এমন প্রস্তাবে আপত্তি আছে দুদকের।

সংস্থার পক্ষ থেকে বিএফআইইউকে জানানো হয় যে কর আদায়ের মাধ্যমে পাচারকারীকে অব্যাহতি দেওয়া হলেও মানি লন্ডারিং আইনে পাচারকারীকে অব্যাহতি দেওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এ ছাড়া এপিজিও এ ব্যাপারে আপত্তি করবে। মুদ্রা পাচারের টাকা ফেরাতে বিএফআইইউ ও দুদকের এমন মনস্তাত্ত্বিক দ্বন্দ্বের মধ্যেই দুদক আলাদা করে পাচারকারীদের শনাক্তের পদক্ষেপ নিয়েছে।

Leave a Reply