ভারতও পেঁয়াজ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে

ভারতও পেঁয়াজ নিয়ে বেশ বিপাকে পড়েছে

গত সপ্তাহে ভারতের কেন্দ্রীয় খাদ্য সরবরাহ মন্ত্রী রাম বিলাস পাসওয়ান দেশটির রাষ্ট্রায়ত্ত্ব সংস্থা এমএমটিসি-কে এক লাখ টন পেঁয়াজ আমদানির নির্দেশ দিয়েছেন। পেঁয়াজের খুচরা দাম নিয়ন্ত্রণের উদ্দেশ্যেই তাঁর এই সিদ্ধান্ত। এ সিদ্ধান্তের ফলে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিকারক থেকে পেঁয়াজ আমদানিকারী দেশে রূপান্তরিত হল!

ভারতে পেঁয়াজের দাম বাড়ল কেন?
গত মে মাস থেকেই ভারতে পেঁয়াজের দামে ঊর্ধ্বগতি লক্ষ্য করা গিয়েছে। এর কারণ মূলত দুটি। নতুন ফসল উঠেছে দেরিতে এবং মূল পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্র, কর্নাটক এবং মধ্য প্রদেশে পেঁয়াজ চাষে ক্ষতি হয়েছে।

অন্যতম পেঁয়াজ উৎপাদনকারী রাজ্য মহারাষ্ট্রে পেঁয়াজের ক্ষেতের পরিমাণ কমে যাওয়ায় পাইকারি বাজারে পেঁয়াজ এসেছে কম। মহারাষ্ট্রে লাসালগাঁওয়ের পাইকারি বাজারে জানুয়ারি মাসের শুরুতে যেখানে ছিল কুইন্টাল প্রতি ৫০০ থেকে ৬০০ টাকা, সেখানে মে মাসের পর সে দাম বেড়ে যায় ১০০০ টাকার উপরে। নাসিক জেলার লাসালগাঁও ভারতের সর্ববৃহৎ পেঁয়াজ বাজার। লাসালগাঁওতে পেঁয়াজের দাম বাড়লে সারা দেশে পেঁয়াজের দাম বাড়ে, সেখানে দাম কমলে সারা দেশে পেঁয়াজের দাম কমে। এখন প্রায় সব শহরেই পেঁয়াজের দাম ৭০ থেকে ৮০ টাকার মধ্যে।

তখনই রবি শস্যে খামতির কারণে সরবরাহ কমে গিয়েছিল। নাসিক, আহমেদাবাদ সহ মহারাষ্ট্রের পেঁয়াজ উৎপাদনকারী এলাকার কৃষকরা রবি শস্যের চাষ করেন এপ্রিলের পর। এই ফসলে আর্দ্রতা কম থাকে বলে তা মজুত করার পক্ষে সুবিধাজনক। মাটির সংস্পর্শে এসে আর্দ্রতার কারণে যাতে পঁচে না যায় বা অঙ্কুর না বেরিয়ে যায়, সে কারণে কৃষকরা একটু উঁচু মাচা তৈরি করে এই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করেন। একে বলে কান্দা চাওল। অক্টোবরের পর নতুন শস্য আসে। ততদিন পর্যন্ত এই মজুত পেঁয়াজই বিক্রি করতে থাকেন কৃষকরা।

বাজারে সারা বছরের খাদ্য জোগায় রবি, প্রথম খারিফ (অক্টোবরের পর চাষ হয়) ও দ্বিতীয় খারিফ (জানুয়ারি-মার্চে চাষ হয়) শস্য। ২০১৮ সালের খরার দরুন এ বছরের রবি শস্য মার খেয়েছিল। বর্ষা দেরিতে আসায় প্রথম খারিফ ও অক্টোবরে অতিবৃষ্টির জন্য দ্বিতীয় খারিফের ফসল উঠতেও দেরি হয়েছিল। এপ্রিলে, মরশুমের শুরুতে কৃষকদের মজুত করা ২২ লাখ টন পেঁয়াজের মধ্যে মাত্র ৫-৬ শতাংশ অবশিষ্ট ছিল। কৃষিমন্ত্রকের দেওয়া তথ্য অনুসারে খারিফ শস্য চাষের জমির পরিমাণ ২০১৮-১৯ সালে যেখানে ছিল ২.৯৭ লাখ হেক্টর, সেখানে এ বছরে হয়েছে ২.৫৮ লাখ হেক্টর। এই হ্রাস মূলত ঘটেছে পেঁয়াজ উৎপাদনকারী মহারাষ্ট্রে, যেখানে দেরিতে আসা বর্ষার দরুণ পেঁয়াজ চাষ প্রায় হয়ইনি।

একই সঙ্গে মধ্যপ্রদেশ, রাজস্থান এবং গুজরাটে সেপ্টেম্বর মাসের অসময়ের ব্যাপক বৃষ্টিপাতের জন্য ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়, যা মূল্যবৃদ্ধির একটি কারণও বটে। মহারাষ্ট্র সারা দেশের মোট পেঁয়াজের ৩৫ শতাংশ উৎপাদিত হয়, সেখানে রবি ও খারিফ শস্যে ফলন কমে।

মূল্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ভারত সরকার কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
জুন মাস থেকে রাজনৈতিক কারণেই ভারতের কেন্দ্রীয় সরকার পেঁয়াজের দামের দিকে নজর রেখে চলেছে। তাদের প্রথম সিদ্ধান্ত আসে জুন মাসে। দেশের বাইরে পেঁয়াজ রপ্তানিতে যে ১০ শতাংশ ভরতুকি দেওয়া হত, তা তুলে নেওয়া হয়। এর পর আরও কঠোর পদক্ষেপ নেওয়া হয়। ১৩ সেপ্টেম্বর পেঁয়াজের ন্যূনতম রপ্তানিমূল্য বাড়িয়ে টন প্রতি ৮৫০ ডলার করা হয়। এর কয়েক সপ্তাহ পরেই পেঁয়াজের রপ্তানি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করে দেওয়া হয় এবং কতটা পেঁয়াজ মজুত করা যাবে, তার পরিমাণও নির্ধারণ করে দেওয়া হয়। এই পরিমাণ পাইকারি ক্ষেত্রে ৫০০ কুইন্টাল এবং খুচরো ক্ষেত্রে ১০০ কুইন্টাল।

মজুতের নির্ধারিত পরিমাণ মানা হচ্ছে না সন্দেহে গত ১১ নভেম্বর আয়কর দপ্তর ব্যবসায়ীদের মজুতের পরিমাণ ও তাঁদের খাতাপত্র পরীক্ষা শুরু করেন। তাঁরা নাসিকের ১৫ জন ব্যবসায়ীর অফিস ও মজুতস্থল পরিদর্শন করেন। সে রিপোর্ট এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। ব্যবসায়ীদের সূত্র জানিয়েছে, দাম নিয়ন্ত্রণের জন্যই এই হানাদারি। তল্লাশির কয়েকদিন পরেই পেঁয়াজের দাম মোটামুটি ঠিক হয়ে যায়। বেশ কিছু বড় ব্যবসায়ী সরকারের ভয়ে পাইকারি বাজার থেকে দূরে থাকেন।

দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য এক লক্ষ টন পেঁয়াজ আমদানির সিদ্ধান্ত ভারত সরকারের সাম্প্রতিকতম পদক্ষেপ।

এই সিদ্ধান্তে কী বদল হল?
রপ্তানি বন্ধ করার সময়েই ভারত সরকার এমএমটিসির সূত্রে টেন্ডারের মাধ্যমে সেপ্টেম্বরের প্রথম সপ্তাহে ২০০০ টন পেঁয়াজ আমদানির রাস্তা খুলে দিয়েছিল। সে টেন্ডারের ফল মেলেনি। তবে বেসরকারি ভারতের ব্যবসায়ীরা পেঁয়াজ আমদানি করতে শুরু করেছিলেন। মনে করা হচ্ছে মুম্বাইয়ের বন্দরে ২০০০ থেকে ৪০০০ টন পেঁয়াজ মজুত রয়েছে এবং তা কয়েকদিনের মধ্যেই বাজারে পৌঁছাবে।

পাসওয়ানের ঘোষণার ফলে ভারত পেঁয়াজ রপ্তানিকারক থেকে পেঁয়াজ আমদানিকারক দেশে পরিণত হল। গত আর্থিক বর্ষে ভারত রপ্তানি করেছিল ২১.৮২ লক্ষ টন পেঁয়াজ, যার দাম ৪৯৭.৯৭ মিলিয়ন ডলার। আমদানি করা হয়েছিল মাত্র ৭০৮০ টন, যার দাম ১.১২ মিলিয়ন ডলার। ভারত মূলত আফগানিস্থান, সংযুক্ত আরব আমিরাত এবং মিশর থেকে পেঁয়াজ আমদানি করে, যদিও এই পেঁয়াজ কেউই পছন্দ করেন না বলে জানাচ্ছেন ভারতের ব্যবসায়ীরা।

ভারতের ব্যবসায়ী আরও বলছেন, আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারের উপর কুপ্রভাব ফেলবে। তার কারণ যে সময়ে আমদানি করা পেঁয়াজ বাজারে এসে পৌঁছাবে, তার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বাজারে আসবে ভারতেই উৎপাদিত নতুন পেঁয়াজও।

সূত্র: দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস

Leave a Reply