ট্রেনচালকের ৩৫% পদ শূন্য

ট্রেনচালকের ৩৫% পদ শূন্য

বাংলাদেশ রেলওয়ের গত ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত হালনাগাদ তথ্যানুসারে, ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত পাঁচটি ক্যাটাগরির চালকদের ১৭৪২ পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৬০৮টি পদ, যা মঞ্জুরি করা পদের প্রায় ৩৫ শতাংশ।

এর মধ্যে মূল রেলপথে সরাসরি ট্রেন পরিচালনায় যুক্ত লোকোমোটিভ মাস্টার (গ্রেড-১)-এর ২৩৬টি পদের মধ্যে ১৬ পদ শূন্য। আর লোকোমোটিভ মাস্টার (গ্রেড-২)-এর ৩৮৮ পদের মধ্যে শূন্য পদ ২১৪টি। মূল রেলপথে ট্রেনচালকের মঞ্জুরি করা ৬২৪ পদের মধ্যে ২৩০টি শূন্য।

চালকদের চাকরি শুরু করতে হয় অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকোমোটিভ মাস্টার গ্রেড-২ পদে যোগদানের মাধ্যমে। রেলে মঞ্জুরি করা এই পদ ৯০৭টি। শূন্য রয়েছে ২৭৮টি। অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকোমোটিভ মাস্টার গ্রেড-১-এর ২৭৭ পদের মধ্যে অবশ্য জনবল একজন কম আছে। আর সাব-লোকোমোটিভ মাস্টারের ২৩৪ পদের মধ্যে শূন্য রয়েছে ৯৯টি।

বাংলাদেশ রেলওয়ে সূত্রে জানা গেছে, ট্রেনচালকের মঞ্জুরি করা এই জনবল কাঠামো ১৯৮৫ সালের। অথচ গত ১০ বছরেই ট্রেন বেড়েছে দ্বিগুণ। বর্তমানে দেশে যাত্রীবাহী ট্রেন চলাচল করছে ৩৬০টি। এ ছাড়া পণ্যবাহী ট্রেন চলাচল করছে ২৬টি। আগে থেকেই ট্রেনের তুলনায় চালকের সংখ্যা কম। ফলে পদোন্নতি পেয়ে অবসরে যাওয়ার পর সংকট তীব্র হলে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয় ওই চালকদের। কিন্তু চুক্তির মেয়াদ শেষ হলে চালক সংকট আরো তীব্র আকার ধারণ করে।

অন্যদিকে ৩৫ শতাংশ চালকের পদ শূন্য থাকায় ট্রেন পরিচালনায় সংকট লেগেই আছে। সংকট দূর না করে সময়সূচি ঠিক রেখে ট্রেন পরিচালনায় বেশি গুরুত্ব দিচ্ছে কর্তৃপক্ষ। ফলে সময়সূচি ঠিক রাখতে সীমিত চালকদেরই বাড়তি সময় ট্রেন চালাতে হচ্ছে। নিয়ম অনুসারে, একজন ট্রেনচালক আট ঘণ্টা ট্রেন চালানোর পর অন্তত ১২ ঘণ্টা বিশ্রাম নেবেন। কিন্তু বর্তমানে পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে, গড়ে প্রতিজন ট্রেনচালককে ট্রেন চালাতে হচ্ছে ১১ ঘণ্টা পর্যন্ত।

লাইনচ্যুতি, অন্য কোনো দুর্ঘটনা বা ভিআইপিদের চলাচলের কারণে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকলে চালকদের সময়সূটি আর ঠিক থাকে না। এর মধ্যে আবার অনেক চালক বাড়তি আয়ের জন্য বিরামহীন ট্রেন চালাতে আগ্রহী। ফলে অনেক সময় তাঁরা চোখে ঘুম নিয়ে ট্রেন চালান। গত সোমবার মধ্যরাতে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবার মন্দবাগে ভয়াবহ ওই ট্রেন দুর্ঘটনার মূল কারণ ছিল তূর্ণা নিশীথা ট্রেনের চালক তাসের আলী ও সহকারী অপু দের শারীরিক ক্লান্তি। তাঁরা ওই সময় ঘুম ঘুম চোখে ট্রেন পরিচালনা করছিলেন। পাশে থাকা গার্ডও ভ্যাকুয়াম চেপে ট্রেন থামাননি। এসব তথ্য একাধিক তদন্ত কমিটি সূত্রে জানা গেছে।

অ্যাসিস্ট্যান্ট লোকোমোটিভ মাস্টার-গ্রেড-২ পদে যোগদানের পর মূল রেলপথের জ্যেষ্ঠ চালক হতে ধাপে ধাপে কমপক্ষে ১০ হাজার কিলোমিটার ট্রেন চালাতে হয়। বর্তমানে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ জ্যেষ্ঠ চালক হতে পাঁচ হাজার কিলোমিটার ট্রেন চালানোর অভিজ্ঞতাকেই অনুমোদন দিচ্ছে।

আবার সহকারী লোকোমোটিভ মাস্টার পদ থেকে লোকোমোটিভ মাস্টার পদে যেতে সময় লাগে ৮ থেকে ১১ বছর। তবে এই পদেও তীব্র সংকট রয়েছে চালকের।

বাংলাদেশ রেলওয়ের সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে জানান, চালক সংকটে যথেষ্ট সময় প্রশিক্ষণ এবং ট্রেন চালনায় অভিজ্ঞতা ছাড়াই পদোন্নতি দেওয়া হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে রাজনৈতিক চাপও থাকে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের তথ্যানুসারে, ২০১৮ সাল পর্যন্ত ১০ বছরে ৩ হাজার ৪৮৬টি ট্রেন দুর্ঘটনায় চার শতাধিক মানুষের প্রাণহানি হয়েছে। ২০১৪ সালের পর থেকে চালকদের ভুলে দুর্ঘটনা বেড়ে যায়। বাড়তে থাকে মুখোমুখি সংঘর্ষ, ধাক্কা, চলন্ত ট্রেন বিভক্ত হয়ে পড়া, লেভেলক্রসিংয়ে দুর্ঘটনা, সিগন্যাল অমান্য, লাইনচ্যুতি ইত্যাদি।

অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে, চালক ছাড়াই ট্রেন ছুটে চলছে বহুপথ। যেমন গত ১৪ অক্টোবর চালক ছাড়াই ঈশ্বরদী থেকে রাজশাহীতে ছুটে যায় পাবনা এক্সপ্রেস। এ ঘটনার পর পাবনা এক্সপ্রেস ট্রেনের চালক আসলাম উদ্দিন খান মিলন, সহকারী চালক আহসান উদ্দিন আশা ও ট্রেন পরিচালক (গার্ড) আনোয়ার হোসেনকে বরখাস্ত করা হয়। এর মধ্যে চালক মিলন ঈশ্বরদী রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সাধারণ সম্পাদক, সহকারী চালক আশা শ্রমিক লীগের একই কমিটির যুগ্ম সম্পাদক। তাঁরা রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে শাস্তি মওকুফ করার চেষ্টা করছেন। তদন্তের পর তাঁদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা রয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন চালক কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্রাম নেওয়ার রানিং রুমগুলোর বেশির ভাগ টিনশেডের। আখাউড়া, লাকসাম, চাঁদপুর, দেওয়ান বাজারসহ বিভিন্ন রেলস্টেশনে এসব রুম অপরিচ্ছন্ন এবং খাবারের ব্যবস্থা নেই। কোথাও কোথাও ফ্যানও চলে না।

সম্প্রতি রেলমন্ত্রী মো. নূরুল ইসলাম সুজন নীলসাগর ট্রেনে সিরাজগঞ্জ যাওয়ার পথে কালের কণ্ঠকে জানান, শুধু চালক নয়, স্টেশনমাস্টারসহ বিভিন্ন পদে জনবলের অভাব রয়েছে। শূন্য পদে নিয়োগের আপ্রাণ চেষ্টা করা হচ্ছে।

রেলসচিব মোফাজ্জেল হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দোষী চালকদের শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি শূন্য পদে নিয়োগের জন্য আমরা উদ্যোগ নিয়েছি।’

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক মো. শামছুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ট্রেনচালক সংকট নিরসনে আমরা প্রস্তাব তৈরি করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পাঠাই। বিভিন্ন প্রক্রিয়া শেষে নিয়োগ দেওয়া হয়। এসব প্রক্রিয়া শেষ করতে সময় লাগে। তার পরও আমরা চেষ্টা করছি সংকট কাটাতে।’

Leave a Reply