আত্মীয় নন এমন কারো কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নেই

আত্মীয় নন এমন কারো কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নেই

আত্মীয় নন এমন কারো কিডনি প্রতিস্থাপনের প্রয়োজন নেই বলে অভিমত দিয়েছেন ছয়জন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও একজন সমাজবিজ্ঞানী। তারা বলেছেন, আইনের বাইরে অন্য কারো কিডনি প্রতিস্থাপনের সুযোগ সৃষ্টি হলে দেশের দরিদ্র মানুষের জীবন সবচেয়ে ঝুঁকির মধ্যে পড়বে। ধনিরা বাণিজ্যিকভাবে এর ব্যবহার করবে। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ পাচারের মাত্রা বাড়বে।

তবে সাত সদস্যের এই বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামতের সঙ্গে একমত নন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা ডা. মোহাম্মদ জাফরুল্লাহ চৌধুরী। তিনি বলেছেন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন বিষয়ে দেশের বর্তমান আইন সংশোধন হওয়া প্রয়োজন। এই আইনে নিকটাত্মীয় ছাড়া অন্য কোরো অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ দান করার সুযোগ নেই। তাই একজন সুস্থ মানুষ চাইলে অন্য কাউকে তার অঙ্গ দান করতে পারেন এমন আইন থাকা দরকার। এটা সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া উচিত। সেক্ষেত্রে দরিদ্র মানুষেরা যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয় সেজন্য আইনে বিশেষ বিধান রাখা প্রয়োজন।

বিচারপতি মইনুল ইসলাম চৌধুরী ও বিচারপতি খোন্দকার দিলীরুজ্জামানের হাইকোর্ট বেঞ্চে আজ বৃহস্পতিবার বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন দাখিল করা হয়। এরপর আদালত কয়েকজন বিশেষজ্ঞ, ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরী ও আইনজীবীদের বক্তব্য শোনেন। এ অবস্থায় আদালত আগামী ২১ নভেম্বর পরবর্তী শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

আদালতে রিট আবেদনকারী পক্ষে আইনজীবী ছিলেন ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম। আদালতে মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পক্ষে আইনজীবী ছিলেন মো. শাহীনুজ্জামান শাহীন ও মাক্কিয়া ফাতেমা ইসলাম।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) প্রো-ভিসি ও বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. মুহাম্মদ রফিকুল আলমের নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদন সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেল কার্যালয়ে দাখিল করা হয় গত ২৯ অক্টোবর। এরপর আজ এই প্রতিবেদন আদালতে উপস্থাপন করেন ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল সাইফুদ্দিন খালেদ। পরে আদালত উপস্থিত বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের বক্তব্য শোনেন।

মানবদেহে কিডনি প্রতিস্থাপন নিয়ে হাইকোর্ট ২০১৭ সালের ২৪ আগস্ট এক আদেশে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯ সালের তিনটি (২গ, ৩ ও ৬) ধারা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চেয়ে রুল জারি করেন। একইসঙ্গে এবিষয়ে গত ১৮ বছরেও তা না করায় বিবাদীদের ব্যর্থতা কেন অসাংবিধানিক ঘোষণা করা হবে না তা জানতে চাওয়া হয়। জনৈকা ফাতেমা জোহরার করা এক রিট আবেদনে এ রুল জারি করা হয়। এরই ধারাবাহিকতায় গত ২৮ আগস্ট হাইকোর্ট কিডনি প্রতিস্থাপন নিয়ে বিশেষজ্ঞ কমিটির মতামত জানতে চান।

এরপর বিএসএমএমইউ প্রো-ভিসি ও বাংলাদেশ রেনাল অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. রফিকুল আলম প্রধান করে একটি কমিটি গঠিত হয়। কমিটির অপর ছয় সদস্য হলেন-কিডনি ফাউন্ডেশনের চিফ কনসাল্ট্যান্ট অধ্যাপক ডা. হারুন-উর-রশিদ, বিএসএমএমইউ’র নেপ্রোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. আসিয়া খানম, বিএসএমএমইউ’র ইউরোলজি বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. একেএম খুরশীদুল আলম, বারডেম হাসপাতালের ইউরোলজি বিভাগের প্রধান অধ্যাপক ডা. মির্জা এম এইচ ফয়সাল, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. নেহাল করিম এবং জাতীয় কিডনি ডিজিসেস ও ইউরোলজি ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মো. নুরুল হুদা।

ফাতেমা জোহরা ২০১৫ সালে তার মেয়ে ফাহমিদাকে একটি কিডনি দান করেন। এরপরও মেয়ের কিডনি অকেজো হয়ে গেছে। এ অবস্থায় কিডনি প্রতিস্থাপনের জন্য দাতা পেলেও আইনগত বাধার কারণে মেয়েকে আর কিডনি দিতে না পেরে রিট আবেদন করেন।

ব্যারিস্টার রাশনা ইমাম বলেন, মানবদেহে অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংযোজন আইন-১৯৯৯-এর ২গ ধারায় দাতার সংজ্ঞায় নিকটাত্মীয় বলতে পিতা-মাতা, ভাই-বোন, পুত্র-কন্যা, চাচা, ফুফু, মামা, খালা ও স্বামী-স্ত্রীকে বলা হয়েছে। কিন্তু ভারতে বিশেষ পরিস্থিতিতে নিকটাত্মীয় ছাড়াও অন্যরা দাতা নেওয়ার সুযোগ রাখা হয়েছে। এক্ষেত্রে কারা দাতা হতে পারবে তা আইনে বলে দেওয়া আছে। কিন্তু আমাদের আইনে তা নেই। এটা থাকা দরকার।

Leave a Reply