কুমারী পূজায় ভক্ত-দশনার্থীদের ঢল

কুমারী পূজায় ভক্ত-দশনার্থীদের ঢল

প্রতিবারের মতো এবছরও শারদীয় দুর্গোৎসবের অষ্টমীতে দেশের রামকৃষ্ণ মঠ ও রামকৃষ্ণ মিশনে কুমারী পূজা হয়েছে। ভোর থেকেই সনাতন ধর্মাবলম্বীরা জড়ো হতে থাকেন রাজধানীর রামকৃষ্ণ মিশনসহ বিভিন্ন মণ্ডপে। সন্ধ্যায় আরতি ও সাস্কৃতিক অনুষ্ঠানে ছিল ভক্তদের ভীড়। শারদীয় দুর্গোৎসবের চতুর্থদিনে আজ সোমবার মহানবমী পূজা অনুষ্ঠিত হবে। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হবে আরতি প্রতিযোগিতা।

অষ্টমী তিথিতে রামকৃষ্ণ মিশন মঠ ও মন্দিরে কুমারী রূপে পূজিত হয়েছে কুমারী মা প্রশংসা প্রিয়তা বন্দোপাধ্যায়। তার জন্ম ২০১৫ সালের পহেলা বৈশাখের দিন। বাবার কোলে চড়ে লাল টুকটুকে বেনারসি পরে মন্দিরে আসে প্রিয়তা। তার বাবা প্রিয় শংকর বন্দোপাধ্যায় কে এল জুবলী স্কুল অ্যান্ড কলেজের ইংরেজি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক। মা গায়ত্রী বন্দোপাধ্যায় ফজলুল হক মহিলা কলেজের সমাজকর্ম বিভাগের বিভাগীয় প্রধান। চাইল্ড হ্যাভেন আইডিয়াল হাই স্কুলের প্লে গ্রুপে পড়াশোনা করছে সে। লক্ষ্মীবাজারেই তাদের বাসা।

শাস্ত্রের বিধান মতে, সকালে কুমারী মা প্রিয়তাকে স্নান করিয়ে নতুন কাপড় পরানো হয়। মাথা ও গলায় ফুলের মালা, অলংকার ও প্রসাধনে নিপুণ সাজে সাজিয়ে তোলা হয় তাকে। এরপরই কুমারী মাকে মন্ত্র পাঠ করে গঙ্গাজল ছিঁটিয়ে শরীর মন শুদ্ধ করে মাতৃজ্ঞান রূপে পূজা করা হয়। ১৬টি উপকরণ দিয়ে কুমারী পূজার আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। অগ্নি, জল, বস্ত্র, পুষ্প ও বাতাস-এ পাঁচটি উপকরণ দিয়ে কুমারীকে পূজা করা হয়। তাকে দেখে মনে হচ্ছিল, মৃন্ময়ীরূপের মা দুর্গা যেন জাগ্রত তার মধ্যে। কিছুটা ভয়, দুষ্টুমি ভরা দৃষ্টি আর আনন্দের ঝিলিক ছিল ছোট্ট এ মেয়েটির অভিব্যক্তিতে।

প্রিয়তাকে দেখতে সকাল থেকেই রামকৃষ্ণ মিশনে ভিড় জমাতে শুরু করেন হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা। ঢাক-ঢোল, বাদ্য আর ভক্তদের উলুধ্বনির মধ্য দিয়ে পূজিত হয় প্রিয়তা বন্দোপাধ্যায়। শাস্ত্র মতে, এ সময় তার নামকরণ করা হয় ‘সুভগা’। কুমারী পূজা সম্পন্ন হলে ভক্তরা মাকে প্রণাম ও দেবী দুর্গার পায়ে অঞ্জলী নিবেদন করেন। ভক্তদের সুবিধার্থে কয়েক দফায় অঞ্জলী দেওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। অঞ্জলী শেষে হাজার হাজার ভক্ত দর্শনার্থীদের মধ্যে বিতরণ করা হয় মহাপ্রসাদ।

অষ্টমী পূজা ছাড়াও রাতে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। অষ্টমীর শেষ নবমীর শুরুর সন্ধিক্ষণে অনুষ্ঠিত হয় সন্ধিপূজা। যেসব মণ্ডপে কুমারীপূজা হয় সেখানে একই দিনে অনুষ্ঠিত হয়েছে তিনটি পূজো। দিনের বেলা অষ্টমী বিহিতপূজা আর কুমারী পূজা পরে সন্ধিপূজা। সকালে ঢাকেশ্বরী জাতীয় মন্দির কেন্দ্রীয় পূজামণ্ডপে দেবীর মহাষ্টমী বিহিত পূজা ও মহাপ্রসাদ বিতরণ করা হয়। সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় আরতী। একইসঙ্গে মন্দিরে মন্দিরে ছিল আলোচনা সভা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। তাই দুপুরের পর থেকে পূজা মণ্ডপগুলোতে ঢল নামে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের।

তবে, অন্যান্য মণ্ডপগুলোর থেকে বসুন্ধরা আবাসিক এলাকার মণ্ডপে ছিল কিছুটা ব্যতিক্রম। সেখানে সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত চলছে স্বেচ্ছায় রক্তদান কর্মসূচি। কোয়ান্টাম ফাউণ্ডেশনের সহযোগিতা গত দুই দিনে অন্ততঃ ৫০ জন স্বেচ্ছায় রক্তদান করেছেন বলে জানান বসুন্ধরা সার্বজনিন পূজা কমিটির সভাপতি শ্রীবাস রায়। তিনি জানান, রক্ত সংগ্রহের পাশাপাশি মানুষের জীবন বাঁচাতে রক্তদানে উদ্বুদ্ধ করতে সচেতনতা সৃষ্টির জন্য প্রচারণা চালানো হচ্ছে।

বসুন্ধরা আই ব্লকের ৮৪৭ নম্বর বাড়িতে মণ্ডপ তৈরি করা হয়েছে। বাড়িটির চারপাশে ব্যানার ফেস্টুনের পাশাপাশি চোখ ধাধানো আলোকসজ্জা করা হয়েছে। কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী পার হয়ে মণ্ডপে প্রবেশ করলেই ডান পাশে পুলিশ কন্ট্রোল রুম ও বাম পাশে স্বেচ্ছা রক্তদান কর্মসূচির ক্যাম্প। আছে আরো কিছু স্টল। সামনে শোলার কারুকাজে সাজানো মন্দিরে প্রতিমা স্থাপন করে পূজা চলছে। ডান পাশে বিশাল মঞ্চে সন্ধ্যা থেকে চলে আলোচনা ও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান।

বসুন্ধরা সার্বজনিন পূজা কমিটির সাধারণ সম্পাদক পবিত্র সরকার কালের কণ্ঠকে জানান, সন্ধ্যা ৭টা থেকে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান শুরু হয়ে চলবে রাত ১১টা পর্যন্ত। মাঝে আরতির জন্য বিরতি দেওয়া হবে। তিনি বলেন, ইতিমধ্যে ঢাকা উত্তর সিটি মেয়রসহ অনেকেই পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে এসেছিলেন। সরকার ও আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীসহ সংশ্লিষ্ট সকলেই পূজার আয়োজনে সহযোগিতা করছে।

এদিকে আজ সোমবার নবমীতে সকাল থেকে পূজা চলবে এবং সন্ধ্যায় আরতি প্রতিযোগিতা হবে। বিজয়া দশমীর দিন সকাল থেকেই পূজা হবে এবং বিকেলে বিজয় শোভাযাত্রা শেষে প্রতিমা বিসর্জন হবে। তাই পূজা যতই শেষের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে মন্দিরে মন্দিরে ততোই ভক্তদের আনাগোনা বাড়ছে। যে কারণে গতকাল সন্ধ্যায় প্রতিটি মণ্ডপের সামনে দেখা যায় তীব্র যানজট।

উৎসব উপলক্ষে বিভিন্ন পূজা মন্ডপের চারপাশ ঘিরে বসেছে মেলা। বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতা, মন্ত্রী, সংসদ সদস্যরাও নগরীর বিভন্ন মণ্ডপ পরিদর্শন করেছেন। সারাদেশের মতো রাজধানীর মন্দিরগুলো ঘিরে ছিল পুলিশ, র‌্যাবসহ নিরাপত্তা বাহিনীর কঠোর নিরাপত্তা বেষ্টনী।

Leave a Reply