বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে স্থবিরতা, হতাশা

বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে স্থবিরতা, হতাশা

কারিগরি লোকসানকে আমলে না নিয়ে একটি মামলায় চার্জশিট দেওয়ার ঘটনায় হতাশ বড়পুকুরিয়া কয়লা খনির কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। মামলায় সাত সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আসামি করায় তাদের সঙ্গে কর্মরত খনির ৮০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই নাজেহালের আশঙ্কা করছেন। তা ছাড়া ভবিষ্যতে কয়লা উৎপাদন, মজুদ ও পরিবহন করতে যে যাবতীয় কারিগরি লোকসান বা সিস্টেম লস হবে, তার দায়ভারও তাদের কাঁধে চাপবে বলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের শঙ্কা। এ অবস্থায় দেশের একমাত্র কয়লা খনিটি স্থবির হওয়ার উপক্রম। অথচ এর আগে সরকার গঠিত তিনটি কমিটির কেউই কয়লা চুরির প্রমাণ পায়নি; বরং উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ কারিগরি কমিটি তাদের তদন্ত প্রতিবেদনে বড়পুকুরিয়ায় ৩ শতাংশ পর্যন্ত সিস্টেম লস গ্রহণযোগ্য হিসেবে উল্লেখ করেছে। যদিও এই খনিতে সিস্টেম লস মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশের মতো। এরপরও মামলার তদন্তে আন্তর্জাতিকভাবে স্বতঃসিদ্ধ সিস্টেম লসকে আমলে না নেওয়ায় বিস্মিত খনিটির সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা। তাদের প্রশ্ন, খনিতে এভাবে সিস্টেম লসের স্বীকৃতি যদি শেষ পর্যন্ত না দেওয়া হয়, তাহলে ভবিষ্যতে খনির এই সিস্টেম লসের দায়ভার কে নেবে?

জ্বালানি বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন, এই মামলায়ও আরেক জাহালম সৃষ্টি হতে চলেছে। সাত সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালককে আসামি করতে গেলে তো তাদের অধীনে কর্মরত সংশ্নিষ্ট বিভাগগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও দায়ী করতে হবে। এ হিসাবে খনির ৮০ শতাংশ কর্মকর্তা-কর্মচারীই তো আসামি হয়ে যায়। এটা একেবারেই নজিরবিহীন পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে।

কয়লায় কোন দেশে কত সিস্টেম লস : বাংলাদেশে ১ দশমিক ৪ শতাংশ, ভারতে ৫, অস্ট্রেলিয়ায় ৮ থেকে ১০, ইন্দোনেশিয়ায় ৭ থেকে ৮, মালয়েশিয়ায় ৬ থেকে ৮ শতাংশ।

যে কারণে সিস্টেম লস : বিশেষজ্ঞ কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মজুদ করে রাখা কয়লায় যে আর্দ্রতা থাকে, তা বাতাসে কমে গেলে ওজন কমে যায়। কয়লা তোলার সময় তার সঙ্গে পানি মিশে থাকে। এই পানি ঝরে গিয়ে এবং রোদের তাপ ও শুস্ক আবহাওয়ায় কয়লার ওজন কমে যায়। খনি তোলার পর ক্র্যাশার মেশিন দিয়ে কয়লা ছোট করা হয়। এতে ক্ষুদ্রাকৃতির গুঁড়া কয়লা বৃষ্টির পানিতে ধুয়ে যায়। অনেক দিন একই স্থানে কয়লা মজুদ থাকায় বেশ কিছু কয়লা মাটির সঙ্গে মিশে যায়। কোলইয়ার্ডে রাখার ফলে আর্দ্রতা কমে শুস্ক আবহাওয়ায় কয়লা প্রজ্বলিত হয়। এটাও সিস্টেম লসের অন্যতম কারণ।

দেশে অন্যান্য সেবা খাতে সিস্টেম লস :বিদ্যুতে ৭ থেকে ৮ শতাংশ, গ্যাসে ২ দশমিক ৫, জ্বালানি তেলে অন্তত ৩ শতাংশ, পাথর খনিতে ২ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ সিস্টেম লস হয়।

সিস্টেম লসের স্বীকৃতি নেই শুধু চার্জশিটে : গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর বড়পুকুরিয়া কোল মাইনিং কোম্পানির বার্ষিক সাধারণ সভায় দীর্ঘ ১৪ বছরে জমে থাকা এক লাখ ৪৪ হাজার ৬৪৪ টন কয়লা ঘাটতিকে সিস্টেম লস হিসেবে অনুমোদন দেওয়া হয়। এর আগে অনুমোদন দেয় কোম্পানির বোর্ড। কয়লা চুরির অভিযোগ উঠলে পেট্রোবাংলা ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি কমিটি গঠন করা হয়। তাদের পরামর্শে সিস্টেম লস নির্ধারণের জন্য সরকার বিশেষজ্ঞ কারিগরি কমিটি। তিনটি কমিটিই কয়লা লোপাটের ঘটনায় কয়লা চুরির কোনো প্রমাণ পায়নি। কিন্তু এই সিস্টেম লসকে আমলে না নিয়েই দুদকের মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সংশ্নিষ্ট এক কর্মকর্তা বলেন, মামলায় যে পরিমাণ কয়লা সরানোর কথা বলা হয়েছে, তা যদি সত্যিও হতো, তাহলে ওই বিপুল পরিমাণ কয়লা সরাতে প্রতি ট্রাকে ১৫ টন করে নিলেও ৯ হাজার ৬২৬টি ট্রাক ব্যবহার করতে হতো; যা বাস্তবসম্মত নয়। তা ছাড়া মামলার প্রতিবেদনে ওই কয়লা কারা, কীভাবে নিয়েছে, কোথায় ব্যবহার করা হয়েছে কিছুই বলা হয়নি।

সরকার গঠিত বিশেষজ্ঞ কারিগরি কমিটির অন্যতম সদস্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূতত্ত্ব বিভাগের অধ্যাপক ও খনি প্রকৌশলী ড. চৌধুরী কামরুজ্জামান বলেন, সেখানে কয়লা চুরি হয়নি। সিস্টেম লসকে চুরি হিসেবে চালিয়ে দেওয়া দুঃখজনক। প্রতিটি সেবা খাতেই সিস্টেম লস আছে। কয়লা খনিতেও থাকবে- এটাই স্বাভাবিক। প্রতিবেশী দেশ ভারতে এটা কমবেশি ৫ শতাংশ। আর বড়পুকুরিয়ায় এটা মাত্র ১ দশমিক ৪ শতাংশ। সিস্টেম লসকে আমলে না নিয়ে যে কোনো পদক্ষেপ নেওয়াটা প্রশ্নবিদ্ধ হবে বলে মনে করেন তিনি।

জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ও বাপেক্সের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক মর্তুজা আহমদ চিশতী বলেন, কারিগরি কারণে সিস্টেম লস আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত-বিজ্ঞানসম্মত। এটা হিসাবে নিলে কোনো মামলাই হওয়ার কথা নয়। তাই চুরি না করেও এই অপবাদ কয়লা খনিতে সার্বিক কার্যক্রম ব্যাহত করতে পারে। এভাবে রাষ্ট্রীয়ভাবে কোম্পানির অধিকাংশকে চোর বানিয়ে দেওয়া লজ্জাজনক ও দুঃখজনক মন্তব্য করে তিনি বলেন, এটা দেশের উন্নয়নকেই বাধাগ্রস্ত করবে। যাদের বিরুদ্ধে মামলা হয়েছে, তাদের অনেকেই আমি ব্যক্তিগতভাবে চিনি; যারা সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত।

সূত্র জানায়, ২০০১ সালে বড়পুকুরিয়া কয়লা খনিতে কাজ শুরু হলেও উৎপাদন শুরু হয় ২০০৫ সাল থেকে। ২০০১ সাল থেকে গত ১৭ বছরে কয়লা খনি পরিচালনার কোনো নীতিমালা বা আইন করা হয়নি। কয়লার সিস্টেম লসের কোনো আদেশও জারি করা হয়নি। বিপদে পড়লেই পরামর্শ নেওয়া হয় খনিতে কর্মরত বিদেশি বিশেষজ্ঞদের। উৎপাদন শুরুর পর থেকে বছর বছর কয়লার সিস্টেম লস সমন্বয় করা হয়নি। এ কারণে ওই সিস্টেম লস জমতে জমতে গত বছর এসে দাঁড়ায় এক লাখ ৪৪ হাজার টনে। এ কারণে একসময় কোলইয়ার্ড খালি হয়ে গেলে বড়পুকুরিয়া কর্তৃপক্ষ বিষয়টি বুঝতে পারে। সিস্টেম লস সমন্বয়ের জন্য গত বছরের ১৮ জুলাই ২৮১তম বোর্ডসভায় দুই সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়। ওই কমিটি রিপোর্ট দেওয়ার আগেই বড়পুকুরিয়ার ১৯ কর্মকর্তাকে আসামি করে দুর্নীতির মামলা দায়ের করা হয়। সম্প্রতি ওই মামলার চার্জশিট দেওয়া হয়েছে। সেখানে ২৩ কর্মকর্তাকে আসামি করা হয়েছে। যার মধ্যে বয়োবৃদ্ধ ও শারীরিকভাবে অসুস্থসহ সাতজন সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালকও রয়েছেন।

Leave a Reply