‘রোহিঙ্গা স্থানান্তর সমর্থন করো, নইলে দেশ ছাড়ো’

‘রোহিঙ্গা স্থানান্তর সমর্থন করো, নইলে দেশ ছাড়ো’

জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমারের ওপর পর্যাপ্ত আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োগ না হওয়ায় হতাশা ব্যক্ত করেছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. একে আবদুল মোমেন।
তিনি বলেছেন, রোহিঙ্গাদের নোয়াখালীর ভাসানচরে স্থানান্তরে বাংলাদেশের যে পরিকল্পনা তাতে জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সমর্থন দিক, নয়তো তারা দেশ ছেড়ে চলে যাক।
গত ২৬ আগস্ট ঢাকায় পররাষ্ট্রমন্ত্রী জার্মান সংবাদ মাধ্যম ডয়চে ভেলেকে দেন। তবে গত বুধবার (৪ সেপ্টেম্বর) এই সাক্ষাতৎকার প্রকাশ করা হয় ।
সাক্ষাৎকারে অধিকাংশ রোহিঙ্গাই মিয়ানমারে ফিরতে চায় না। সে কারণেই কি বাংলাদেশ তাদের ভাসানচরে সরাতে চাইছে এমন প্রশ্নের জবাবে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘আমার মনে হয় রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানোর এখনই সময়। তবে ওই দ্বীপে সব রোহিঙ্গাকে পাঠানো সম্ভব নয়। আমরা মাত্র এক লাখ রোহিঙ্গাকে সেখানে পাঠাতে পারি। আমরা তাদের জোর করে পাঠাতে চাই না। আমরা আশা করেছিলাম, তারা স্বেচ্ছায় সেখানে যাবে। সেখানে তারা অর্থনৈতিক কার্যক্রম চালাতে পারবে। কিন্তু কক্সবাজারে কাজ করা ত্রাণ সংস্থাগুলো ভাসানচরে যেতে চায় না। কক্সবাজারে তারা পাঁচ তারকা হোটেলে থাকতে পারেন, তাই তারা অন্য জায়গায় যেতে চান না। আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থার মধ্যে যারা রোহিঙ্গা ইস্যুকে রাজনীতিকরণ করতে চাইছে আমরা তাদের খুঁজে বের করার চেষ্টা করছি।’
তার মানে কি এই যে, জাতিসংঘের সংস্থাগুলো বাংলাদেশের পরিকল্পনা সমর্থন না করলেও রোহিঙ্গাদের ভাসানচরে পাঠানো হবে এমন প্রশ্নে ড. মোমেন বলেন, ‘হ্যাঁ সম্ভবত। আমরা অনেক লিফলেট, সিডি ও ভিডিও জব্দ করেছি, যেগুলোয় রোহিঙ্গাদের নির্দিষ্ট কিছু দাবি না মানলে মিয়ানমারে ফিরে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে। মিয়ানমার কর্তৃপক্ষ কিছু দাবি মানতে রাজি হয়েছে, যেমন নিরাপত্তা দেওয়া ও চলাফেরার অনুমতি। তবে রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্ব প্রদান, হত্যাকা-ে জড়িতদের শাস্তি দেওয়া, রোহিঙ্গাদের এথনিক গোষ্ঠী হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং তাদের নিজেদের ঘরবাড়িতে ফেরার অনুমতি দেওয়ার মতো দাবি মানা হয়নি।’
জাতিসংঘের সমর্থন ছাড়া বাংলাদেশ এক লাখ রোহিঙ্গাকে ভাসানচরে সরাতে পারবে কিনা এমন প্রশ্নে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, আমরা তা করতে পারব। তাতে জাতিসংঘ কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে এর উত্তরে তিনি বলেন, ‘জাতিসংঘকে এই পরিকল্পনা মেনে নিতে হবে, নয়তো তারা রোহিঙ্গাদের তাদের সঙ্গে নিয়ে যেতে পারে। এই মানুষদের অনেকেই ইতোমধ্যে অপরাধমূলক কার্যক্রমে জড়িয়ে পড়েছে। ওই এলাকায় রোহিঙ্গাদের সংখ্যা স্থানীয়দের প্রায় দ্বিগুণ। স্থানীয়রা নিয়মিত অপরাধমূলক কার্যক্রমের অভিযোগ করছে। আমরা তা হতে দিতে পারি না। সে কারণে আমরা তাদের ভাসানচরে যেতে বাধ্য করতে পারি। বাংলাদেশ ধনী দেশ নয়। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাষ্ট্র। এর পরও আমরা রোহিঙ্গাদের জন্য অনেক কিছু করেছি। এখন অন্যদের এগিয়ে আসতে হবে কারণ এটা শুধু আমাদের সমস্যা নয়। এটা একটা আন্তর্জাতিক ইস্যু। আমরা যদি তাদের নিরাপত্তা না দিতাম, তা হলে তারা গণহত্যার শিকার হতে পারত। আমরা তাদের যে কোনো জায়গায় পাঠাতে রাজি, যে কারও কাছে, যারা তাদের নিতে চায়। তাদের অনেক বছর রাখার সামর্থ্য আমাদের নেই। আমরা তাদের চিরদিন রাখতে পারি না।’
জাতিসংঘের বিরোধিতা করার সামর্থ্য বাংলাদেশের আছে কিনা এর উত্তরে ড. মোমেন বলেন, জাতিসংঘ আমাদের বেশি সাহায্য করছে না। তারা মিয়ানমারের রাখাইনে অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে পারছে না। জাতিসংঘের এ সংস্থাগুলো কেন মিয়ানমারে কাজ করছে না? তাদের মিয়ানমারে যাওয়া উচিত, বিশেষ করে রাখাইনে। সেখানে এমন পরিবেশ তৈরি করা উচিত, যা রোহিঙ্গাদের ফিরতে সহায়তা করতে পারে। জাতিসংঘের কাছ থেকে আমরা যে কাজ প্রত্যাশা করি, তা তারা করছে না।
জাতিসংঘের সংস্থাগুলো যদি আপনাদের পরিকল্পনা সমর্থন না করে তা হলে কী বাংলাদেশ তাদের তাড়িয়ে দেবে, এমন প্রশ্নে ড. মোমেনের উত্তর যদি প্রয়োজন হয়, আমরা তা-ই করব।
ভাসানচরের পরিবেশ বিষয়ে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এটা নিরাপদ। আমরা সেখানে সুন্দর বাড়ি ও বাঁধ নির্মাণ করেছি। আমরা যদি বাংলাদেশিদের সেখানে যেতে বলি তা হলে তারা নিশ্চয় যাবে।

Leave a Reply