‘যদি একদিন’ ছবির আবেদন হৃদয়ের কাছে

‘যদি একদিন’ ছবির আবেদন হৃদয়ের কাছে

মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজের ‘যদি একদিন’ ছবিটি সম্প্রতি মুক্তি পেয়েছে। এটি রাজের পঞ্চম চলচ্চিত্র। এখানে একজন পরিণত চলচ্চিত্রকারকে দেখা গেছে, যিনি জানেন, কীভাবে দর্শকদের প্রেক্ষাগৃহে ধরে রাখতে হয়। আগের চলচ্চিত্রগুলোর মতো এ ছবিতেও রাজ মূলধারার চলচ্চিত্রের মধ্যে ভিন্ন কিছু করার চেষ্টা করেছেন। বলা যায়, এখানে জীবন আছে, বাস্তবতা আছে, আবার জীবনকে ছাপিয়ে অন্য কিছুও রয়েছে; সিনেমাটিক ব্যাপার-স্যাপার রয়েছে।

চলচ্চিত্রটি রাজ বোদ্ধা দর্শকদের জন্য নির্মাণ করেননি; নির্মাণ করেননি উচ্চবিত্ত কিংবা মধ্যবিত্তদের জন্য। সব শ্রেণির দর্শক ছিল তাঁর টার্গেট। আরেকটি কথা, মনন নয়, দর্শকদের হৃদয়ের কাছে এ ছবির আবেদন।

ফয়সাল (তাহসান) একটি প্রতিষ্ঠানের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা। কাজের ব্যাপারে খুব সিরিয়াস। তাই তার অধস্তনেরা সব সময় তটস্থ থাকে। অন্যদিকে, ব্যক্তিগত জীবনে সে তার মেয়ে রূপকথাকে (আফরীন শিখা) ভীষণ ভালোবাসে। মেয়ের সুখই তার কাছে সবকিছু, বাকি সব তুচ্ছ। তাই তো মায়ের (সাবেরী আলম) বিয়ের প্রস্তাবে সে রাজি হয় না। অফিসের নতুন মার্কেটিং অফিসার অরিত্রী আশরাফকেও (শ্রাবন্তী) ফয়সাল প্রত্যাখ্যান করে। বলে, ‘আমাদের বাবা ও মেয়ের মাঝে আপনি আসবেন না।’ অরিত্রী ভীষণ শকড হয়। তাই সুপারস্টার কণ্ঠশিল্পী জেমির (তাসকিন) বিয়ের প্রস্তাবে রাজি হয়। কিন্তু বিয়ের আসরে জেমির আমন্ত্রণে তার পুরোনো বন্ধু ফয়সাল এসে সবকিছু বানচাল করে দেয়। জানা যায়, রূপকথার প্রকৃত বাবা জেমি, ফয়সাল নয়। যদিও রূপকথার মাকে মনে মনে ভীষণ ভালোবাসত ফয়সাল। তাই তো রূপকথাকে জন্ম দেওয়ার সময় ওর মা মারা গেলে ফয়সাল পরম মমতায় রূপকথাকে বুকে তুলে নেয়। পিতার চেয়েও অধিক স্নেহে লালন-পালন করে। জেমি সবকিছু শুনে অনুতপ্ত হয়। ক্ষমা চায়। তারপর আর কী! কক্সবাজারে অরিত্রীকে বিয়ের প্রস্তাব দেয় ফয়সাল, তখন অদূরে সাগরসৈকতে হেঁটে বেড়াচ্ছে রূপকথা।

পাঠক, যত সহজে আমি রূপকথার প্রকৃত পরিচয় তুলে ধরলাম, ছবিতে কিন্তু এত সহজে বিষয়টি খোলাসা করেননি পরিচালক মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ এবং অন্যতম চিত্রনাট্যকার আসাদ জামান। তাঁরা আস্তে আস্তে সুতো ছেড়েছেন, পেঁয়াজের খোসার মতো উন্মোচন করেছেন রূপকথার জন্মবৃত্তান্ত। ফলে, বিষয়টি বড় চমক হিসেবে দেখা দেয় দর্শকদের সামনে। তারা এটি আগে বুঝতেই পারেনি। যদিও চলচ্চিত্রকার ও চিত্রনাট্যকার কিছুটা ইঙ্গিত দিয়েছেন ছবিটির ইংরেজি নাম (THE SACRIFICE) এবং ফয়সালের মায়ের কথায়। তিনি একবার ফয়সাল এবং আরেকবার ফোনে আরেকজনের সঙ্গে কথা বলার সময় ‘যদি একদিন…’ বলেই থেমে যান। সচেতন দর্শকদের কেউ কেউ হয়তো তখন থমকে গিয়েছিলেন, তাঁদের মনে হয়তো নানা ভাবনার উদয় হয়েছে। কিন্তু তাঁরাও ব্যাপারটি ধরতে পারেননি সংগত কারণেই। এ জন্য চলচ্চিত্রকার ও চিত্রনাট্যকারের প্রশংসা করতেই হয়। আসলে এ ছবির গল্পের প্রাণভোমরা লুকিয়ে ছিল ওই বিষয়ের মধ্যে। তাই সহজে তা উন্মোচন করতে চাননি রাজ ও আসাদ। বিষয়টি তাঁরা দক্ষ হাতে সামলেছেন এবং দর্শকদের আগ্রহ ও উত্তেজনাকে তুঙ্গে নিয়ে যাওয়ার পরে রহস্য উন্মোচন করেছেন। একটি আদর্শ বিনোদনমূলক চলচ্চিত্রের চরিত্র এমনটিই হওয়া উচিত এবং তা হওয়ার ফলে ছবিটি বেশ উপভোগ্য হয়ে উঠেছে।
বাবা-মেয়ের সম্পর্কের এমন আবেগঘন চলচ্চিত্রায়ণ বহুদিন এ দেশের দর্শকেরা দেখেনি। এ মুহূর্তে আমার মনে পড়ছে গত শতকের সত্তর দশকের শেষ পর্যায়ের একটি চলচ্চিত্র ‘দ্য ফাদার’-এর কথা। সেখানেও এমনই এক বাবা-মেয়ের আবেগঘন সম্পর্ক দেখা গিয়েছিল এবং তারাও সেই ছবিতে সত্যিকারের বাবা-মেয়ে ছিল না। যা হোক, ‘যদি একদিন’ ছবিতে বাবা-মেয়ের মধুর সম্পর্ক চলচ্চিত্রটির মূল বিষয় হলেও গল্পকার আর চিত্রনাট্যকার মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজ আরও কয়েকটি বিষয় নিয়ে খেলা করেছেন। যেমন পুরুষ ও নারী দর্শকদের ইগোকে পরিতৃপ্ত করার জন্য কিছু দৃশ্য সৃষ্টি করা হয়েছে। তাই পুরুষ দর্শকেরা যখন ছবিতে দেখে ফয়সাল কাজের ক্ষেত্রে এমন সিরিয়াস যে রূপসী নারীকেও সে ছাড় দেয় না, কাজের কথার বাইরে অন্য কোনো কথা বলে না, তখন তারা খুবই খুশি হয়। পেছনের সারির দর্শক সেই খুশি চেপে রাখলেও সামনের সারির দর্শক মুহুর্মুহু করতালিতে তা ঠিকই জানান দেয়। অন্যদিকে, বান্ধবীকে নিয়ে একদিন অরিত্রী এক রেস্টুরেন্টে খেতে যায়। সেখানে সে দেখিয়ে দেয়, কত সহজে সে পুরুষদের নাচাতে পারে। আর বোকা বনে যাওয়া পুরুষদের উদ্দেশে অরিত্রীর বান্ধবী বলে ওঠে, ‘ভেড়ার দল।’ এই দৃশ্য দেখে নিশ্চয় নারী দর্শকদের ইগোও তৃপ্ত হয়। তবে ৮ মার্চ আন্তর্জাতিক নারী দিবসে জয়া (নারীদের ব্যবহৃত একটি বিশেষ পণ্য) নিবেদিত এ ছবির মুক্তি কোনো তাৎপর্যই বহন করে না।

ছবিতে ফয়সাল ও অরিত্রীকে তেমন ঘনিষ্ঠ অবস্থায় দেখা যায় না। কেন? ফয়সাল অরিত্রীর বস বলে? কিন্তু স্বপ্নদৃশ্যেও তো ফয়সাল শুধু অরিত্রীর হাত নিয়ে খেলা করে; অরিত্রীর মুখের কাছে নিয়ে যায় নিজের মুখ, কিন্তু দুজন দুজনের ঠোঁটকে স্পর্শ করে কি না, তা দর্শকেরা বুঝতে পারে না। শুধু শেষ দৃশ্যে দেখা যায় ফয়সালের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়েছে অরিত্রী। এভাবে দর্শকদের অতৃপ্ত রেখে শেষে তৃপ্ত করেছেন চলচ্চিত্রকার। অনেকটা গত শতকের পঞ্চাশ দশকের উত্তম-সুচিত্রা অভিনীত বাংলা ছবির মতো, যেখানে শেষ দৃশ্যেই সুচিত্রাকে বুকে পেত উত্তম। এটাই ছিল তাঁদের ছবির একটি বৈশিষ্ট্য। ব্যবসায়িক কৌশলের একটি পদ্ধতি।

দর্শকদের বিভ্রান্ত করতেও পরিচালক মোস্তফা কামাল রাজ ওস্তাদ ব্যক্তি। যেমন ফয়সালের কথায় আহত হয়ে অরিত্রী যখন বান্ধবীর সঙ্গে শপিংয়ে যায়, তখন বিদেশ থেকে প্রত্যাগত সুপারস্টার গায়ক জেমির সঙ্গে বান্ধবীর মাধ্যমে পরিচিত হয়। কিন্তু তার মধ্যে কোনো উচ্ছ্বাস দেখা যায় না। তাই তো জেমি বলে, ‘ক্রেজি ফ্যান! কিন্তু চোখ তো সেটা বলছে না।’ দর্শক ভাবে, ব্যাপারটি তাহলে বেশি দূর এগোবে না। কিন্তু অরিত্রীর হাতে অটোগ্রাফ হিসেবে জেমি নিজের যে ফোন নম্বর লিখে দিয়েছিল, সেই নম্বরে রাতেই ফোন করে অরিত্রী। দুজনের পরিচয় গভীর হয়। দর্শক মনে মনে অরিত্রীকে গালি দেয় ‘ফালতু মেয়ে’ বলে। তারপর একদিন একটি রেস্টুরেন্টে জেমিকে নিয়ে খেতে যায় অরিত্রী। সেখানে আগে থেকে বসে ছিল ফয়সাল ও তার মেয়ে রূপকথা। ওদের দেখেও না দেখার ভান করে অরিত্রী। কিন্তু ফয়সাল ও রূপকথা চলে যাওয়ার পরে অরিত্রীর দুচোখ তাদের খুঁজে ফিরে। দর্শক তখন আশ্বস্ত হয়। ভাবে, ‘আচ্ছা, তাহলে এই ব্যাপার! অরিত্রী ঈর্ষা জাগাতে চাইছে ফয়সালের মনে। জেমির সঙ্গে ওর সম্পর্কটি আর এগোবে না?’

কিন্তু তাদের ভাবনা এবারেও ঠিক হয় না। দেখা যায়, বিয়ের আসরে অরিত্রী কনে সেজে বসে আছে। রূপকথার ফোনকল আর তার ‘মা’ ডাকও তাকে এ বিষয়ে নিবৃত্ত করতে পারে না। এভাবে বারবার দর্শকদের বিভ্রান্ত করেছেন চলচ্চিত্রকার। এতে হয়তো সচেতন দর্শক বিরক্ত হয়েছেন, কিন্তু সামনের সারির দর্শকেরা ঠিকই বিষয়টি উপভোগ করেছেন। কেননা, বাংলাদেশের বাণিজ্যিক ছবির এই দর্শকেরা এ ধরনের বিভ্রান্তিতে অভ্যস্ত। তারা বিষয়টি উপভোগও করেন। তাই তো বাণিজ্যিক চলচ্চিত্রে গল্পের গরু কখনো কখনো শুধু গাছেই ওঠে না, আকাশেও উঠে যায়।

উল্লেখ্য, এই শ্রেণির দর্শকদের খুশি করার জন্য সংলাপ রচয়িতা আসাদ জামান কয়েকটি স্থূল সংলাপও রেখেছেন ফয়সালের অফিসের নিম্নপদস্থ কর্মচারীদের মুখে। চলচ্চিত্রকার ও সংলাপ রচয়িতার উদ্দেশ্য সফল হয়েছে। দর্শক ওই সব সংলাপ শুনে হেসেছে। মজা পেয়েছে। তবে তারা সবচেয়ে খুশি হয়েছে এই সংলাপ শুনে, যখন ফয়সালের অ্যাপার্টমেন্ট ভবনের নিচতলার বাসিন্দা তার ভীষণ অনুরাগিণী মেয়েটি বলে ওঠে, ‘যখন রূপকথার বিয়ে হয়ে যাবে, আপনি একা হয়ে যাবেন, আমি সেই দিনের প্রতীক্ষায় থাকলাম।’

তবে দর্শকদের হাসাতে গিয়ে কখনো কখনো বাড়াবাড়ি করে ফেলেছেন আসাদ জামান। যেমন কক্সবাজারে যখন একদিন রূপকথাকে খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না, টেনশনের সেই মুহূর্তে জনৈক অভিনেতার মুখে আঞ্চলিক ভাষার সংলাপ হাসির উদ্রেক করলেও তা দৃশ্যটির মেজাজকে ক্ষুণ্ন করেছে।

ছবিতে অ্যাকশন দৃশ্য নেই, তবু অ্যাকশনের অনুভূতি সঞ্চারিত হয় দর্শকমনে, যখন জেমিরূপী তাসকিনের চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে ফয়সাল অর্থাৎ তাহসান।…একটি শটে পত্র-পুষ্পহীন একটি গাছ দেখা গেছে। এর মাধ্যমে চলচ্চিত্রকার-চিত্রনাট্যকার ফয়সালের জীবনের শূন্যতাকে নির্দেশ করেছেন প্রতীকী ব্যঞ্জনায়। বিষয়টি কারও কাছেই দুর্বোধ্য ঠেকবে না।
দুটি অসংগতি রয়েছে। যেমন মায়ের ফোন পেয়ে অফিস থেকে হন্তদন্ত হয়ে বাসায় ছুটে যায় ফয়সাল। কেন? মেয়ের কোনো বিপদ হয়েছে? বিষয়টি স্পষ্ট নয়।…অরিত্রীকে সালোয়ার-কামিজ পরা অবস্থায় বান্ধবীর সঙ্গে বাইরে যেতে দেখে ওর মা বলে ওঠে, ‘বাহ্, সালোয়ার–কামিজে তো তোকে মানিয়েছে বেশ। পরিস না কেন?’ অরিত্রী তখন মাকে বলে, ‘তুমি কখনো বলোনি তাই।’ ব্যাপারটি বেশ অস্বাভাবিক, তাই নয় কি? এ ছাড়া ফয়সাল ওর মেয়ে রূপকথাকে স্কুলে পৌঁছে দিচ্ছে, বিষয়টি দুবার দেখানো হয়েছে। দ্বিতীয়টি বাহুল্য বলে মনে হয়েছে।

গানগুলো চমৎকার। এর জন্য গীতিকার এস এ হক অলীক আর আসিফ ইকবালকে ধন্যবাদ। সুরকার এবং সংগীত পরিচালক ইমরান, হৃদয় খান ও নাভেদ পারভেজ ধন্যবাদের দাবি রাখেন। ‘আমি পারব না তোমার হতে’ দুবার দুভাবে ব্যবহৃত হয়েছে। প্রথমবার রোমান্টিক আবহে সামান্য অংশ, অরিত্রী যে ফয়সালের হৃদয় স্পর্শ করেছে, এটি বোঝাতে। দ্বিতীয়বার পুরো গান। সেখানে ফয়সালের দুঃখ, অসহায়ত্ব আর হাহাকার ঝরে পড়ে। উল্লেখ্য, দুবারই গানটি ব্যাকগ্রাউন্ডে ছিল। এটি প্রশংসনীয়। চিত্রায়ণও মনকে তৃপ্তি এবং চোখকে আরাম দেয়। তবে ‘লক্ষ্মীসোনা’ গানটি শ্রুতিমধুর হলেও সেটি চলচ্চিত্রটিকে থমকে দেয়। বোরিং লাগে।

অভিনয় প্রসঙ্গে প্রথমেই বলতে হয় তাহসানের কথা। ফয়সালের চরিত্রে তিনি অনবদ্য অভিনয় করেছেন। মনেই হয়নি এটি তাঁর প্রথম চলচ্চিত্র। কেউ কেউ হয়তো তাহসানের চলচ্চিত্রে অভিনয়ে ‘স্ক্রিন পার্সোনালিটি’ও খুঁজে পাবেন। রূপকথার ভূমিকায় শিশুশিল্পী আফরীন শিখা দুর্দান্ত পারফরমেন্স করেছে কিংবা রাজ ওর কাছ থেকে চমৎকার অভিনয় আদায় করে নিয়েছেন। তাসকিন ‘ঢাকা অ্যাটাক’ ছবির পর অভিনেতা হিসেবে আবার নিজের যোগ্যতার প্রমাণ রাখলেন। তবে আগের ছবিতে তাঁর অভিনয়ে দর্শক শুধু ক্রূরতাই দেখেছে। এ ছবিতে ক্রূরতার পাশাপাশি হাসি, কান্না, আবেগ আর বন্ধুর প্রতি ভালোবাসায় দোলায়িত হতেও দেখা গেছে তাঁকে। এ ছাড়া শ্রাবন্তী, সাবেরী আলম, ফখরুল বাশার, মিলি বাশারসহ অন্যরা চরিত্রের দাবি মিটিয়েছেন।

মুহাম্মদ মোস্তফা কামাল রাজকে অভিনন্দন সুস্থ বিনোদনের উপভোগ্য একটি চলচ্চিত্র উপহার দেওয়ার জন্য। বাংলাদেশের চলচ্চিত্রশিল্পের ক্রান্তিকালে এমন চলচ্চিত্রই বেশি করে নির্মিত হওয়া উচিত। তবেই এ প্রজন্মের দর্শক হলমুখী হবে এবং অন্যরাও হলে ফিরবে, নিয়মিত যাবে।

Leave a Reply