আলাদা চলার প্রস্তুতি শরিক দলগুলোর

আলাদা চলার প্রস্তুতি শরিক দলগুলোর

নতুন সরকারের মন্ত্রিসভায় জায়গা পাওয়ার আর কোনো সম্ভাবনা দেখছে না আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন ১৪–দলীয় জোটের শরিকেরা। সরকারের বাইরে থেকেই সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর ভূমিকা রাখতে হবে—সরকারের এ মনোভাব এখন অনেকটাই পরিষ্কার। এর ফলে এক দশক ধরে সরকারের সঙ্গে অন্য দলের মিলেমিশে থাকার ধারাবাহিকতায় একধরনের ছেদ পড়ছে। শরিক দলগুলোর সামনেও নিজেদের ঘর গোছানো ছাড়া বিকল্প কিছু নেই।

সরকারপ্রধানসহ আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বক্তব্যে স্পষ্ট যে শরিক দলগুলোকে বিরোধী দল হিসেবে কার্যকর ভূমিকায় দেখতে চায় আওয়ামী লীগ। এর আরেকটি লক্ষ্য, বিএনপিকে চাপে রাখা। তবে সরকারের লক্ষ্য যা–ই হোক, শরিক দলগুলো নিজ নিজ ফোরামে সভা করে তাদের অবস্থান চূড়ান্ত করবে। ইতিমধ্যে ওয়ার্কার্স পার্টি পলিটব্যুরোর এবং জাসদ জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে।

২০০৪ সাল থেকে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে কাজ করছে ১৪–দলীয় জোট। আন্দোলনের পাশাপাশি গত তিনটি নির্বাচনেও জোটবদ্ধ ছিল তারা। তবে এর আগের দুই মন্ত্রিসভায় থাকলেও এবার তাদের রাখা হয়নি। পরবর্তী সময়ে মন্ত্রিসভায় যুক্ত হওয়ার আশা করা হলেও সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের বক্তৃতা-বিবৃতিতে সেই সম্ভাবনা দেখছে না তারা। এমনকি ভবিষ্যৎ নির্বাচনেও জোট না থাকার আভাস পাচ্ছে শরিকেরা।

শরিক দলের দুজন নেতা প্রথম আলোকে জানান, একাদশ সংসদ নির্বাচনে আগের চেয়ে কম প্রার্থীকে সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগ। এ ছাড়া ওই সময় আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতা-কর্মীদের প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, এবার শরিকদের দেওয়া হচ্ছে, ভবিষ্যতে সব নৌকার প্রার্থী করা হবে। আর গত শনিবার আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতাদের সঙ্গে বৈঠকের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী তো শরিকদের নিজের পায়ে দাঁড়ানোর কথা বলেই দিয়েছেন। নিরঙ্কুশ ক্ষমতার অধিকারী সরকারি দলের কথায় মনে হচ্ছে তাদের আর কাউকে প্রয়োজন নেই।

এ প্রসঙ্গে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমরা যাঁরা রাজনৈতিক দল করি, তাঁরা নিজের পায়ে দাঁড়িয়েই রাজনীতি করি। তাই প্রধানমন্ত্রী কী বোঝাতে চেয়েছেন, তা ঠিক পরিষ্কার নয়।’ এখন উপজেলা নির্বাচন সামনে রেখে দলীয় প্রস্তুতির দিকে মনোযোগ দিচ্ছেন তাঁরা।

তবে শরিক দলের এক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, বিএনপি-জামায়াত জোটকে গত ১০ বছরে অনেক দুর্বল করে দেওয়া হয়েছে। বিএনপিকে আরও চাপে রাখতে সরকারি দলের সঙ্গে সম্পর্কিত দলগুলোকে বিরোধী দলের ভূমিকায় রাখতে চায় আওয়ামী লীগ। তাই জাতীয় পার্টিকেও এবার পুরোপুরি বিরোধী দলের ভূমিকায় রাখা হয়েছে।

এ প্রসঙ্গে ১৪ দলের সমন্বয়ক ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য মোহাম্মদ নাসিম প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ইচ্ছা সরকার ও বিরোধী দলে থাকুক মুক্তিযুদ্ধের পক্ষ শক্তি। তাই সরকারে না থেকে সংসদের ভেতরে ও বাইরে ভূমিকা রাখতে পারে শরিকেরা। আওয়ামী লীগের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে তাদের সাংগঠনিক শক্তিও বাড়াতে পারে। তবে আদর্শিক জোট হিসেবে ১৪ দল টিকে থাকবে বলেও জানান তিনি।

সূত্র জানায়, ২০ জানুয়ারি পলিটব্যুরোর সদস্যদের বৈঠক ডেকেছে ওয়ার্কার্স পার্টি। ২ ও ৩ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে হাসানুল হক ইনুর নেতৃত্বাধীন জাতীয় সমাজতান্ত্রিক দল (জাসদ)। আর ১ ও ২ ফেব্রুয়ারি জাতীয় নির্বাহী কমিটির সভা ডেকেছে জাসদের (আম্বিয়া) একাংশ। সরকারি দলের সঙ্গে রাজনৈতিক বোঝাপড়া, সরকারের বাইরে থেকে বিরোধী দল হিসেবে সংসদের ভেতরে ও বাইরে কার্যকর ভূমিকা রাখার বিষয়ে আলোচনা হতে পারে সভায়। মার্চ থেকে শুরু হতে যাওয়া উপজেলা নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়েও আলোচনা করা হবে।

জাসদের সাধারণ সম্পাদক শিরীন আখতার প্রথম আলোকে বলেন, প্রধানমন্ত্রী অনেক দিন ধরেই শরিক দলগুলোকে আরও শক্তিশালী হওয়ার তাগিদ দিয়ে আসছেন। জাসদও দলের শক্তিমত্তা বাড়ানোর বিষয়ে আরও মনোযোগী হচ্ছে।

শেখ হাসিনার নেতৃত্বে এবার ৪৭ জনের নতুন মন্ত্রিসভার সবাইকে নেওয়া হয়েছে আওয়ামী লীগ থেকে। ১৯৭৩ সালের পর শতভাগ দলীয় মন্ত্রিসভা পেয়ে খুশি হয়েছেন তৃণমূল থেকে শুরু করে কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগ নেতা-কর্মীরা। তবে মন্ত্রিসভায় জায়গা না পেয়ে হতাশ হয়েছেন ১৪–দলীয় জোটের শরিকেরা। তাঁরা মনে করছেন, শরিকদের প্রয়োজনীয়তা ফুরিয়ে গেছে।

জাসদ একাংশের সভাপতি শরীফ নুরুল আম্বিয়া প্রথম আলোকে বলেন, রাজনৈতিক কারণে জোট হয়েছে, রাজনৈতিক কারণেই তাঁরা জোটে থাকবেন। তবে জোটের বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত অবশ্যই প্রধানমন্ত্রীর ওপর নির্ভর করে।

লম্বা বিরতির পর শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৯৯৬ সালে ১৪৬ আসনে বিজয়ী হয় আওয়ামী লীগ। সরকার গঠনের জন্য ৩২টি আসন নিয়ে জাপা ও একটি আসন নিয়ে জেএসডির সমর্থন পায় তারা। জাপা থেকে আনোয়ার হোসেন ও জেএসডি থেকে আ স ম আবদুর রবকে মন্ত্রিসভার সদস্য করা হয়। এরপর ২০০৮ সাল থেকে গত তিনটি নির্বাচনেই জোটবদ্ধভাবে অংশ নেয় আওয়ামী লীগ। এককভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠতা পেলেও গত দুই সরকারের মন্ত্রিসভায় শরিকদের রেখেছিল আওয়ামী লীগ। তবে এবার সে ধারাবাহিকতা অক্ষুণ্ন থাকেনি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে নতুন গঠিত মন্ত্রিসভার ৪৭ জনের মধ্যে ২৪ জন মন্ত্রী, ১৯ জন প্রতিমন্ত্রী এবং ৩ জন উপমন্ত্রীর ৪৩ জন আওয়ামী লীগ থেকে নির্বাচিত সাংসদ। আর টেকনোক্র্যাট কোটায় আসা তিনজনও আওয়ামী লীগের।

জানতে চাইলে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য হারুন-অর-রশিদ প্রথম আলোকে বলেন, একাদশ সংসদ নির্বাচন ও নতুন মন্ত্রিসভা গঠনের মাধ্যমে রাজনীতিতে নতুন অধ্যায়ের শুরু হয়েছে। ১৪ দলের শরিক দলগুলো মন্ত্রিসভায় নেই, তবে তারা যদি বিরোধী দলের ভূমিকা পালন করে, তাহলে সাংবিধানিক কোনো বাধা নেই। বরং তারা যদি সংসদের ভেতরে ও বাইরে গঠনমূলক ভূমিকা পালন করে, তাহলে গণতান্ত্রিক চর্চার যে ধারা শুরু হয়েছে, তা আরও এগিয়ে যাবে এবং রাজনীতিতে নতুন মাত্রা ও সংস্কৃতি গড়ে উঠবে।

Leave a Reply