চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার করোনা চিত্রে ধাঁধায় মার্কিন গোয়েন্দারা

চীন-রাশিয়া-উত্তর কোরিয়ার করোনা চিত্রে ধাঁধায় মার্কিন গোয়েন্দারা

বিশ্বব্যাপী ছড়িয়ে পড়া মারাত্মক করোনাভাইরাসের উৎপত্তি হয়েছিল চীনে। তবে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে পড়ার পর ভাইরাসের প্রকোপ কমতে শুরু করেছে চীনে। এরই মধ্যে আক্রান্তের সংখ্যায় চীনকে টপকে গেছে যুক্তরাষ্ট্র। মৃত্যুপুরীতে পরিনত হয়েছে ইতালি,স্পেন ও যুক্তরাষ্ট্র। তবে চীনের মিত্র দেশ বলে পরিচিত উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ায় তুলনামূলক করোনার সংক্রমণ কম। এটা কেন এবং কিভাবে ঘটছে সেটা নিয়ে ধন্দে পড়েছেন মার্কিন গোয়েন্দারা। তারা এই ঘটনার রহস্য কিছুতেই উদঘাটন করতে পারছেন না।

মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি বিশ্বের করোনভাইরাস প্রাদুর্ভাবের সঠিক কারণ ও চিত্র উদঘাটনের করার চেষ্টা করছেন। গোয়েন্দা প্রতিবেদনের সাথে যুক্ত মার্কিন সরকারের পাঁচ সূত্রে জানা গেছে, তারা চীন, রাশিয়া এবং উত্তর কোরিয়ার পরিস্থিতি মূল্যায়নের দক্ষতার ক্ষেত্রে গুরুতর অসামঞ্জস্যতা খুঁজে পেয়েছেন।

দু’টি সূত্র জানিয়েছে, গোয়েন্দা সংস্থাগুলি ইরানের মহামারিটির প্রভাব সম্পর্কেও সীমিত অন্তর্দৃষ্টি রেখেছেন। যদিও সেখানে জনসাধারণের পাশাপাশি সরকারি কর্মকর্তা ও রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তিদেরও সংক্রমণ ও মৃত্যুর বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে।

এই চারটি দেশ মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলির ‘কঠোর লক্ষ্য’ হিসাবে পরিচিত, কারণ এসব দেশের তথ্যের উপর রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণ ছিল এবং সাধারণ সময়ে এমনকি তাদের বন্দি নেতৃত্বের বিষয়েও তথ্য জানা কঠিন। ফলে খুব সতর্কতার সঙ্গে এসব দেশের তথ্য জোগাড়ে নেমেছে মার্কিন গোয়েন্দারা।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এই দেশগুলির প্রাদুর্ভাবের সঠিক মূল্যায়ন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক বিশ্বের জন্য খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কোভিড-১৯ এর মানবিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতিগুলি কমিয়ে আনতে এটা আন্তর্জাতিক প্রচেষ্টাকে সহায়তা করবে।

গোয়েন্দা সংস্থাগুলি কেবল সঠিক আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যাই অনুসন্ধান করছে না, বরং সংকটটি কিভাবে সেসব দেশে মোকাবেলা করা হচ্ছে সেটার দিকেও গভীর নজর রাখা হচ্ছে।

মার্কিন ফরেন ডিজেস্টার অ্যাসিসট্যান্ট ও সেন্টার ফর গ্লোবাল ডেভেলপমেন্ট এর নেতৃত্বদানকারী থিঙ্কট্যাঙ্কের বিশেষজ্ঞ জেরেমি কোয়ানডিক বলেছেন, ‘বিশ্বজুড়ে এই মহামারি ছড়িয়ে পড়ার মূল হটস্পটগুলি কোথায় এবং সেগুলি কিভাবে বিকশিত হচ্ছে সে সম্পর্কে আমরা যথাযথ এবং রিয়েল-টাইম তথ্য পেতে চাই। পৃথিবী এই ভয়ঙ্কর জিনিস থেকে যতক্ষণ মুক্তি পাবে না ততক্ষণ আমরা এই প্রচেষ্টা সর্বত্র চালিয়ে যাবো।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে একাধিক গোয়েন্দা সূত্র জানিয়েছে, মার্কিন গোয়েন্দা সংস্থাগুলি সর্বপ্রথম জানুয়ারিতে করোনাভাইরাস সম্পর্কে রিপোর্টিং শুরু করে এবং চীনের প্রাদুর্ভাব সম্পর্কে মার্কিন আইনজীবীদের প্রথম দিকে সতর্কবার্তা সরবরাহ করেছিল। যেখানে এটি গত বছরের শেষ দিকে উহান শহরে উদ্ভূত হয়েছিল বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

রয়টার্সের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, প্রায় ২০০ টি দেশ ও অঞ্চলে মহামারিটি ছড়িয়েছে। আক্রান্ত হয়েছে প্রায় ৭ লক্ষাধিক মানুষ। শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই আক্রান্ত হয়েছে ১ লাখ ৬৪ হাজার। এদের মধ্যে মৃত্যু হয়েছে ৩ হাজার ১৭৩ জনের।

ডিরেক্টর অফ ন্যাশনাল ইন্টেলিজেন্সের কার্যালয়, যা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ১৭ টি গোয়েন্দা সংস্থাকে তদারকি করে তারা এ বিষয়ে কোনও মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানিয়েছে।

চীনের সীমান্ত লাগোয়া দেশ উত্তর কোরিয়া দাবি করেছে সেখানে করোনায় একজনও আক্রান্ত হয়নি। যদিও কিম জং উনের দেশটি আন্তর্জাতিক সাহায্য সংস্থাগুলিকে মুখোশ ও টেস্ট কিটের মতো প্রয়োজনীয় সরঞ্জাম সরবরাহের জন্য বলেছে।

কোয়ানডিক বলছিলেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের একটি সূত্র বলেছে, সম্পূর্ণভাবে রুদ্ধ দেশটিতে আসলে সত্যিই কী ঘটেছে সে সম্পর্কে আমরা কিছুই জানি না। এটি একটি পারমাণবিক-সজ্জিত দেশ, যেখানে সরকারকে অস্থিতিশীল করতে পারে এমন বিষয়গুলি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অত্যন্ত সংবেদশীল হবে।’

রাশিয়ান কর্তৃপক্ষ দেশজুড়ে লকডাউন ঘোষণা করেছে। সেখানে এখন পর্যন্ত মোট ১ হাজার ৮৩৬ জনের করোনায় আক্রান্ত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে এবং ৯ জনের মৃত্যু হয়েছে বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।

রাশিয়ার করোনভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার সম্পূর্ণ ব্যাপ্তি জানা গুরুত্বপূর্ণ, কারণ অন্যান্য ১৪ টি দেশের সঙ্গে দেশটির সীমান্ত রয়েছে এবং এটি বাণিজ্য ও ভ্রমণের কেন্দ্রস্থল।

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সেক্রেটারি অফ স্টেট মাইক পম্পেও গত সপ্তাহে রাশিয়া ও ইরানের সম্পর্কে সঠিক তথ্যের ঘাটতির বিষয়ে ইঙ্গিত করেছেন এবং বেইজিংয়ের বিরুদ্ধে তথ্য লুকানোর মাধ্যমে ভাইরাসটি ছড়িয়ে দেওয়ার অভিযোগ করেছেন।

চীন যে ৮১ হাজারেরও বেশি মানুষ করোনায় আক্রান্ত হয়েছিল এবং ৩ হাজারেও বেশি মারা গেছে বলে সরকারের পক্ষ থেকে দাবি করা হচ্ছে সেটাও বিশ্বাসযোগ্য মনে হচ্ছে না। চীন যে বর্তমানে সেখানে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা প্রায় শূন্যে নেমে আসার দাবি করছে এবং নতুন আক্রান্তদের প্রায় সবাই বিদেশফেরত বলছে সেটাও বিশ্বাসযোগ্য নয়।

একটি সূত্র অনুসারে, নতুন কোনও ঘরোয়া সংক্রমণ না হওয়ার বিষয়ে চীনাদের যে দাবি সে সম্পর্কে মার্কিন দৃষ্টিভঙ্গি হল-এর কয়েকটি সত্য হতে পারে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দারা চীনাদের এই ভাইরাস নিয়ন্ত্রণে রাখার বিষয়ে সন্দেহ পোষণ করে।

কোয়ানডিক বলেছেন, বেইজিং প্রাথমিক প্রাদুর্ভাবের তীব্রতা গোপন করেছে এবং এখনও সেখানে সঠিক চিকিৎসা করা হচ্ছে বলে মনে হয় না। চীন অত্যন্ত বড় জনসংখ্যার একটি দেশ হয়েও যেভাবে অতিদ্রুত মহামারি করোনার বিকাশ রোধ করতে সক্ষম হয়েছে সেটা নিঃসন্দেহে তাদের তাদের বড় সফলতা। যদি তাদের সংক্রমণ ও মৃত্যুর দাবি সঠিক হয়। সারা বিশ্বের জন্য সত্যটা জানা খুব জরুরি। চীন কিভাবে এই মহারিকে নিয়ন্ত্রণ করলো এবং এর সঙ্গে খাপ খাইয়ে নিল সেই রহস্য জানা সত্যিই গুরুত্বপূর্ণ।’

সূত্র- রয়টার্স।

আন্তর্জাতিক শীর্ষ খবর