সংসদে না গিয়েই ১৭ কোটি টাকা!

সংসদে না গিয়েই ১৭ কোটি টাকা!

কা: সংসদে যান না চারদলীয় জোটের এমপিরা। সংসদে গিয়ে তারা জনগণের কথা বলেন না। জনগণের কোনো কাজও করেন না। দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডেও কোনো অবদান রাখেন না তারা। তথাপি গত চার বছরে তারা জনগণের টাকায় বেতনভাতা নিয়েছেন ১৭ কোটি টাকা। শুল্কমুক্ত বিলাসবহুল গাড়ি কেনার ক্ষেত্রেও তারা পিছিয়ে নেই। সংসদ সচিবালয়ের সূত্র এ তথ্য জানায়।

সূত্র আরও জানায়, চারদলীয় জোটের এমপিরা প্রতিদিনের অধিবেশন ভাতা নিয়েছেন ৪০ লাখ টাকারও বেশি। সংসদের অন্যান্য ভাতাও নিয়েছেন তারা।

দেশের উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে অংশ না নিয়ে ও জনগণের কল্যাণে কোনো অবদান না রেখে বিরোধী দলীয় এমপিদের এই বেতনভাতা গ্রহণকে অনৈতিক বলে অভিহিত করেছেন রাষ্ট্র বিজ্ঞানী ও বিশিষ্ট জনরা।

সংসদ সচিবালয়ের দেওয়া তথ্য অনুসারে, চলতি নবম জাতীয় সংসদের ১৫টি অধিবেশনে মোট কার্যদিবস ছিলো ৩৩৭। এর মধ্যে বিএনপিসহ চারদলীয় জোটের সদস্যরা সংসদে এসেছেন মাত্র ৫৪ দিন।

তথ্য অনুযায়ী অধিবেশনে একজন সংসদ সদস্য যোগ দিলে দৈনিক ভাতা পান এক হাজার টাকা। যদি কোনো সদস্য অধিবেশনে যোগ না দেন, তবে দৈনিক ৩৭৫ টাকা করে ভাতা পান। বিরোধী দলের সব সদস্যই নিয়মিত এ ভাতা নিয়ে থাকেন।

সংসদ সচিবালয় সূত্রে জানা গেছে, সংসদে না গিয়ে চারদলীয় জোটের সদস্যরা গত ১৫টি অধিবেশনে ৪০ লাখ টাকারও বেশি অধিবেশন ভাতা তুলেছেন। আর দল হিসেবে ৫৪ দিন অধিবেশনে গিয়ে তুলেছেন ২০ লাখ টাকারও বেশি।

অধিবেশনে যোগ না দিলেও বিএনপির প্রায় সব এমপিই শুল্কমুক্ত গাড়ি, বিদেশ সফর, বেতন-ভাতাদিসহ সব সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছেন। পারিতোষিক ও অন্যান্য ভাতা বাবদ একজন সংসদ সদস্য মাসে এক লাখ ৫০০ টাকা করে পান।

চারদলীয় জোটের বর্তমানে সংসদ সদস্য ৩৭ জন। এর মধ্যে জামায়াতের সংসদ সদস্য দুই জন। বাংলাদেশ জাতীয় পার্টির (বিজেপি) একজন। বাকি ৩৪ জন বিএনপির সংসদ সদস্য। সংরক্ষিত মহিলা এমপি পাঁচজন।

চারদলীয় জোটের এমপিরা শুধু বেতনভাতা বাবদ গ্রহণ করেছেন ১৬ কোটি ৬৪ লাখ ২৮ হাজার টাকা। বিরোধীদলীয় নেতা খালদা জিয়া গত ৪ বছরে ৭৮ লাখ ৮ হাজার টাকা বেতনভাতা বাবদ গ্রহণ করেছেন।

উল্লেখ্য, যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে আটক থাকার কারণে বিএনপির সালাহ উদ্দিন কাদের চৌধুরী ও ছুটি নেওয়ায় কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসাইন কায়কোবাদ দীর্ঘদিন ধরে বেতন-ভাতা তুলছেন না।

সংসদ সচিবালয় সূত্র জানায়, বেতন, আবাসিক, যাতায়াত এবং অন্যান্য ভাতা বাবদ এমপিরা মাসে ৬০ হাজার টাকা করে পেয়ে থাকেন। গাড়ির জ্বালানি, রক্ষণাবেক্ষণ ও চালকদের বেতন বাবদ পান মাসে ৪০ হাজার টাকা। এসব ভাতার সবই সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তোলেন বিএনপির সংসদ সদস্যরা।

সংসদ সচিবালয়ে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, সংসদে যোগ না দিয়ে ভাতা গ্রহণে সরকারি দলের এমপিরাও পিছিয়ে নেই। সংসদে যোগ না দিলেও প্রতিদিনের ভাতা ৩৭৫ টাকা নেননি এমন কোনো সংসদ সদস্য নেই।

জানা গেছে, সংসদের হিসাব শাখা থেকে বিভিন্ন ভাতা উত্তোলনের বিল তৈরি করে এমপিদের কাছে পাঠানো হয়। এরপর সংশ্লিষ্ট এমপি ওই বিলে স্বাক্ষর করে বিল তোলেন।

২০১০ সালে সংসদ সদস্যদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধি সংক্রান্ত বিল পাস হয়। ওই বিল পাসের ফলে অধিবেশনকালীন এমপিদের অবস্থান ভাতা ২০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করা হয়। পারিতোষিকও বাড়ানো হয় এ সময়।

জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ উপাধ্যক্ষ আবদুস শহীদ বাংলানিউজকে বলেন, “বিরোধী দলের সদস্যরা কেন সংসদে আসেন না, তা শুধু তারাই বলতে পারেন। সংসদীয় কমিটিতে বিরোধী দলের সদস্যরা ঠিকই আসছেন। কিন্তু অধিবেশনে আসছেন না।”

অধিবেশন ভাতা গ্রহণ সম্পর্কে তিনি বলেন, “অধিবেশনে না এসে ভাতা নেওয়াটা আইনে রয়েছে। তাই যারা সংসদে না এসে যারা ভাতা নিচ্ছেন, তারা বেআইনি কিছু করছেন না। তবে সংসদ সদস্য হিসেবে সংসদে না আসাটা অনৈতিক।”

“সংসদে যোগ না দিয়ে ভাতা নেওয়াটা নৈতিকতা বর্জিত” বলে মন্তব্য করেন আব্দুস শহীদ।

প্রসঙ্গত, সংসদ বর্জন করে অর্থনেতিক সুবিধা নেওয়ার রেওয়াজ শুরু হয় ৫ম সংসদে। সে সময় বিরোধী দল ছিল বর্তমান ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ। অষ্টম সংসদেও একই আচরণ করে আওয়ামী লীগ।

তবে চিফ হুইপের এই বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন বিরোধী দলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদীন ফারুক।

তিনি বলেন, “অধিবেশনে যোগ না দিয়ে বিএনপির এমপিরা কোনো আর্থিক সুবিধা নেন না।”

সরকারি দলের অভিযোগ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সুবিধার সংজ্ঞা আগে তাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে। সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি আওয়ামী লীগেরই তৈরি। তারাই ৫ম সংসদ থেকে সংসদ বর্জন শুরু করে গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে।”

সংসদীয় রাজনীতি গবেষক ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের লোক প্রশাসন বিভাগের অধ্যাপক নিজাম উদ্দিন আহমেদ বাংলানিউজকে বলেন, “কাজ না করে কারোরই উচিত না ভাতা গ্রহন করা। এটি সম্পূর্ণ অনৈতিক।”

তিনি বলেন, “সর্বসম্মতভাবে আইন প্রণয়ন করে সংসদ বর্জনের সংস্কৃতি রোধ করা দরকার। তা না হলে প্রতিষ্ঠান হিসেবে সংসদ অকার্যকর হয়ে যাবে।”

এদিকে ৭ম জাতীয় সংসদের সরকারি হিসাব কমিটির সভাপতি ও আওয়ামী লীগের সাবেক এমপি এসএম আকরাম বাংলানিউজকে বলেন, “আইন করে সংসদ বর্জন বন্ধ করা যাবে না। আইন কে করবে? এখন যারা সরকারি দল তারাই পরে বিরোধী দল হতে পারে। সবাই বিরোধী দলে থাকলে একই আচরণ করে।”

তিনি বলেন, “সার্বিক রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন না হলে এ অবস্থার উন্নয়ন ঘটবে না।”

বাংলানিউজের অনুসন্ধানে জানা গেছে, বিলাসবহুল গাড়ি আমদানিতেও পিছিয়ে নেই বিএনপির এমপিরা। বর্তমান সরকারের আমলে বিলাসবহুল গাড়ি এনেছেন বিএনপির একাধিক এমপি।

শুল্কমুক্ত কোটায় গাড়ি এনেছেন ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ, এম কে আনোয়ার ও জয়নুল আবদিন ফারুক।

সূত্র জানায়, সংসদ সদস্য হিসেবে ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ নিয়েছেন ২৯৭২ সিসির ব্র্যান্ড নিউ মিতসুবিশি পাজেরো, এম কে আনোয়ার ২৮৩৫ সিসির ব্র্যান্ড নিউ মিতসুবিশি পাজেরো, বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ জয়নুল আবদিন ফারুক ৪৪৬১ সিসির ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার, জয়নাল আবেদিন (ভিপি জয়নাল) ২০১১ মডেলের ২৯৮২ সিসির ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো, শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও জাফরুল ইসলাম চৌধুরী নিয়েছেন ২০১১ মডেলের ৪৪৬১ সিসির ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার স্টেশন ওয়াগন।

অ্যাডভোকেট মজিবর রহমান সরোয়ার নিয়েছেন ২০১১ মডেলের ৪৪৬১ সিসির ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার স্টেশন ওয়াগন, ব্যারিস্টার মাহবুব উদ্দিন খোকন ২০১১ মডেলের ২৬৯০ সিসির ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার প্রাডো এবং সৈয়দা আসিফা আশরাফী পাপিয়া আমদানি করেছেন ২০১১ মডেলের ৪৪৬১ সিসি ব্র্যান্ড নিউ টয়োটা ল্যান্ডক্রুজার স্টেশন ওয়াগন গাড়ি।

 

অর্থ বাণিজ্য রাজনীতি শীর্ষ খবর