সাগরের সম্পদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

সাগরের সম্পদ দিয়ে টেকসই উন্নয়ন সম্ভব: প্রধানমন্ত্রী

দেশের টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে সামুদ্রিক সম্পদের সুষ্ঠু ব্যবহার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা।

সোমবার এক আলোচনা সভায় তিনি বলেন, “সমুদ্র এবং সামুদ্রিক সম্পদের অপার সম্ভাবনাকে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কাজে লাগিয়ে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব।”

যে দেশ সমুদ্রকে যতো বেশি ব্যবহার করতে পেরেছে, সে দেশ অর্থনীতিকে ততো বেশি এগিয়ে নিতে পেরেছে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্ত করার ৩০ বছর পূর্তি উদযাপন উপলক্ষে রাজধানীর ওসমানী স্মৃতি মিলনায়তনে এই আলোচনা সভার আয়োজন করা হয়।

প্রধানমন্ত্রী অনুষ্ঠানে বলেন, বঙ্গোপসাগরের সম্পদ বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নে যুগান্তকারী ভূমিকা রাখতে পারে।

“সমুদ্রসীমা নির্ধারণের ফলে আমরা আমাদের গভীর সমুদ্রের ব্লকগুলোতে অবাধে খনিজ সম্পদ অনুসন্ধান করতে পারব।

“এছাড়া আমাদের সমুদ্র সৈকতে প্রাপ্ত বিভিন্ন মূল্যবান খনিজসম্পদ আহরণের সুযোগ রয়েছে। অন্যান্য রাষ্ট্র বঙ্গোপসাগরের তলদেশ থেকে ইতোমধ্যে খনিজ সম্পদ উত্তোলন শুরু করেছে।”

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে নৌ বাণিজ্যের গুরুত্বের কথাও অনুষ্ঠানে তুলে ধরেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের সীমানা সুনির্দিষ্ট হওয়ায় সমুদ্রপথে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ও ব্যবসা বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দেশি-বিদেশি জাহাজের নিরাপদ চলাচলের সুযোগ বাড়ল।

সমুদ্র উপকূলবর্তী এবং উন্নয়নশীল দেশ হিসাবে বাংলাদেশের জন্য জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন বিশেষ গুরুত্বের কথাও অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন শেখ হাসিনা।

তিনি বলেন, “মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের দীর্ঘকাল ধরে অনিষ্পন্ন সমুদ্রসীমা নির্ধারণে এর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।”

জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশনকে বাংলাদেশের সম্ভাব্য উন্নয়নের জন্য ‘একটি গুরুত্বপূর্ণ চালিকাশক্তি’ হিসাবে উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রধানমন্ত্রী তার বক্তব্যের শুরুতেই মুক্তিযুদ্ধের ৩০ লাখ শহীদ এবং দুই লাখ নির্যাতিত নারীকে স্মরণ করেন।

জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন ও আস্থা নিয়ে বর্তমান সরকারের দায়িত্ব নেয়ার কথা উল্লেখ করে অনুষ্ঠানে তিনি বলেন, “আমরা জনগণের শাসক নই, সেবক।”

মতভেদ ভুলে সাধারণ মানুষের ভাগ্যোন্নয়নে সবাইকে বকেসঙ্গে কাজ করার আহবান জানান তিনি।

স্বাধীনতার পর সমুদ্রসীমা ও জলসীমা আইন প্রণয়নের কথা উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, এই আইনের মাধ্যমে গভীরতাভিত্তিক একটি বেজলাইন, ১২ নটিক্যাল মাইল রাষ্ট্রাধীন সমুদ্র এবং ২০০ নটিক্যল মাইল পর্যন্ত অর্থনৈতিক অঞ্চলে সব প্রাণিজ ও খনিজ সম্পদের উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করা হয়।

ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার মাধ্যমে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সে সময় সমুদ্রসীমা নির্ধারণের প্রক্রিয়া শুরু করেন বলেও শেখ হাসিনা স্মরণ করেন।

তিনি বলেন, “জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশনে স্বাক্ষরের মাধ্যমে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের জনগণের অধিকার রক্ষার সুযোগ সৃষ্টি হয়। কিন্তু পরবর্তী সরকারগুলো কোনো পদক্ষেপ না নেয়ায় এ বিষয়ে অগ্রগতি হয়নি।”

উপকূলবর্তী দেশ হিসেবে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের স্বার্থ জড়িত থাকার কথাও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি বলেন, “বঙ্গোপসাগরের অপর দুই অংশীদার ভারত ও মিয়ানমারের সঙ্গে সীমানা নির্ধারিত না থাকায় বিগত চার দশক ধরে আমরা সমুদ্র তলদেশের সম্পদ আহরণে বাধাগ্রস্ত হয়েছি।… জেলে সম্প্র্রদায় মৎস্য আহরণে বাধার সম্মুখীন হয়েছেন। আমাদের মৎস্যসম্পদ অন্য দেশের জেলেরা অবাধে শিকার করেছে। আমরা কিছুই করতে পারিনি।”

আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় থাকতে ২০০১ সালে জাতিসংঘ সমুদ্র আইন কনভেনশন অনুসমর্থন করে। পরবর্তী সরকার জাতিসংঘে দাবি জমা না দেওয়ায় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার ক্ষমতায় এসে ২০১০ সালের মার্চ মাসে প্রথমবারের মত বঙ্গোপসাগরে সিসমিক জরিপ শেষ করে।

সব আইনগত ও কারিগরি বাধ্যবাধকতা শেষ করে ২০১১ সালের ২৫শে ফেব্রুয়ারি ২০০ নটিক্যাল মাইলের বাইরেও মহীসোপানের দাবি জাতিসংঘে পেশ করে বাংলাদেশ। দীর্ঘ শুনানির পর চলতি বছর ১৪ মার্চ আন্তর্জাতিক সমুদ্র আইন বিষয়ক ট্রাইব্যুনাল বাংলাদেশের পক্ষে রায় দেয়।

“আমি দেশবাসীর কাছে কৃতজ্ঞ এ কারণে যে, ভোট দিয়ে ক্ষমতায় এনে তারা এই দাবি উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়”, বলেন প্রধানমন্ত্রী।

তিনি ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে সমুদ্রবিজ্ঞান বিভাগ চালু এবং কক্সাজারের রামুতে দেশের প্রথম ‘জাতীয় সমুদ্র গবেষণা ইন্সটিটিউট’ প্রতিষ্ঠার কথা অনুষ্ঠানে উল্লেখ করেন।

“সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের ওপর আমাদের প্রায় ৩০ লাখ মানুষের জীবিকা নির্ভরশীল। বঙ্গোপসাগরে বিদ্যমান মৎস্যসম্পদের সঠিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে বাংলাদেশে মৎস্য শিল্পের বিশাল প্রসার ঘটানো সম্ভব।”

বাংলাদেশের পরিবেশগত ভারসাম্য রক্ষায় সুন্দরবনের গুরুত্বের কথা তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন,
“বঙ্গোপসাগরের পরিবেশ ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আমরা বঙ্গোপসাগরের নির্দিষ্ট এলাকাকে সংরক্ষিত এলাকা ঘোষণার উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।”

সমুদ্র পরিবহন ব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় দক্ষ জনবল তৈরিতে সরকারের উদ্যোগের কথা উল্লেখ করে শেখ হাসিনা বলেন, আন্তর্জাতিকমানের নাবিক তৈরিতে ১৩টি মেরিন একাডেমি আছে। বেসরকারি উদ্যোগেও মেরিন একাডেমি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সরকারি পর্যায়ে দেশে আরও ৬টি মেরিন একাডেমি প্রতিষ্ঠার কাজ চলছে।

আন্তর্জাতিক সমুদ্র পথে অবাধ বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের জন্য উন্মুক্ত ও নিরাপদ রাখার লক্ষ্যে এবং মহীসোপান এলাকার সম্পদ রক্ষায় নৌ বহিনী এবং কোস্টগার্ডকে শক্তিশালী করার যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও বলেন শেখ হাসিনা।

সমুদ্র আইন কনভেনশন স্বাক্ষরের জন্য উন্মুক্তকরণের ৩০ বছর পূর্তিতে জাতিসংঘের মহাসচিব বান কি মুনের একটি ভিডিও বার্তাও অনুষ্ঠানে প্রচার করা হয়।

সমুদ্র আইন কনভেনশন ও বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের দাবির ওপরে তথ্যচিত্র উপস্থাপন করেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব খুরশীদ আলম।

অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ভারপ্রাপ্ত সচিব মুসতাফা কামাল।

অন্যদের মধ্যে পররাষ্ট্র মন্ত্রী দীপু মনি, পেট্রোবাংলার চেয়াম্যান মো. হোসেন মনসুর, ল’ কমিশনের চেয়ারম্যান শাহ আলম এবং বাংলাদেশে জাতিসংঘের আবাসিক প্রতিনিধি নিল ওয়াকার অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন।

অন্যান্য অর্থ বাণিজ্য বাংলাদেশ শীর্ষ খবর