আর্থিক সংকটে সরকার, অবহেলিত শেয়ারবাজার

সামষ্টিক অর্থনীতিতে ভারসাম্য বজায় রাখতে সরকার শেয়ারবাজারের দিকে যথেষ্ট নজর দিতে পারছে না। অর্থনৈতিক মন্দার মধ্যে আর্থিক সংকটে থাকায় সরকারকে অনেক অজনপ্রিয় সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে। এর মধ্যে জ্বালানি তেল, গ্যাস, বিদ্যুতের দাম বাড়ানো এবং ভর্তুকি কমানো অন্যতম।

এতো কিছুর পরও আর্থিক শৃঙ্খলা ভঙ্গের উপক্রম হলে সরকারকে ঋণ নিতে হচ্ছে। আর সরকারের জন্য ঋণের যোগান দিতে গিয়ে ব্যাংকগুলোর অবস্থা ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়ছে। ফলে চাহিদা অনুযায়ী তারল্যের যোগান দিতে পারছে না ব্যাংকিং খাত। এছাড়া চলতি অর্থবছরের সেপ্টেম্বর শেষে সার্বিক ব্যাংকিং খাতে ঋণ অবলোপন (ব্যাংকের খেলাপি ঋণের মূল হিসাব থেকে সরিয়ে ফেলা) করা অর্থের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২১ হাজার ৪৯৩ কোটি ৫০ লাখ টাকা। অথচ বছরের ২য় প্রান্তিকে (মার্চ- জুন) যার পরিমাণ ছিল ২১ হাজার ৩০৭ কোটি ৭৮ লাখ টাকা। সে হিসেবে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর ঋণ অবলোপনের প্রবণতা এ সময়ে বেড়েছে ১৮৫ কোটি ৭২ লাখ টাকা। মুনাফার টাকায় প্রভিশন রেখে ঋণ অপলোপনের ঘোষণা দেয়া হয় বিধায় অনেক ব্যাংকের সক্ষমতা কমে যাওয়ার কথা।

অপরদিকে সরকারের অর্থ সংগ্রহের অন্যতম ক্ষেত্র সঞ্চয়পত্র বিক্রিতেও মন্দা পড়েছে। এ অবস্থায় সরকার ঋণের যোগান বাড়াতে মুদ্রা বাজারের শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে একদিকে অসমভাবে সুদের হার বাড়াচ্ছে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলো যাতে সরকারকে ঋণ দিতে বাধ্য হয় সেজন্য আলাদা নীতি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

এছাড়া সরকারের ঋণের যোগান নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ৩ মাস মেয়াদি ট্রেজারি বিলের সুদ হার ১১ শতাংশে উন্নীত করেছে। এ সরকারের শুরুতে এ সুদের হার ছিল ৬ থেকে ৭ শতাংশ। এছাড়া ৫ বছর মেয়াদি ট্রেজারি বন্ডের সুদের হার উন্নীত করা হয়েছে সাড়ে ১১ শতাংশে। অথচ ৩/৪ বছর আগে এ সুদের হার ছিল ৯ থেকে ১০ শতাংশের মধ্যে। দীর্ঘ মেয়াদী ঋণের চেয়ে স্বল্প মেয়াদী ঋণ নিয়ে বিপাকে পড়ায় স্বল্প মেয়াদে যারা সরকারকে ধার দিচ্ছে তাদেরকে বেশি সুদ দেয়া হচ্ছে।

তারল্য সংকট মোকাবেলায় ব্যাংকগুলো আমানতের সুদের হার বাড়িয়ে রেখেছে। ৫ বছর মেয়াদি হিসাবে এখন সুদ দেয়া হচ্ছে ১২ থেকে ১৩ শতাংশ। স্বল্প মেয়াদি আমানতে অর্থাৎ ১ থেকে ৩ বছর মেয়াদি হিসাবে সুদ দেয়া হচ্ছে ৯ থেকে ১১ শতাংশ।

এদিকে, শেয়ারবাজার অস্থির হয়ে পড়ায় বিনিয়োগকারীরা এখন ব্যাংকমুখী হয়ে পড়ছেন। ফলে শেয়ারবাজারে তারল্য প্রবাহ কমে গেছে। আর ব্যাংকের টাকা নিয়ে যাচ্ছে সরকার। ফলে ওই টাকাও শেয়ারবাজারে আসছে না।

সঞ্চয়পত্রের সুদের হার বাড়ানো এবং আয়কর জটিলতা নিরসন করায় বিনিয়োগকারীদের একটি অংশ চলে যাচ্ছেন নিরাপদ সঞ্চয়ী উপকরণের দিকে। ফলে শেয়ারবাজারে তারল্য  প্রবাহ বাড়ছে না। যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে সার্বিক লেনদেনে।

সংশি¬ষ্টরা বলেছেন, সার্বিক অর্থনীতিকে সঠিক পথে রাখতে সরকার ইচ্ছে করলেও এদিকে যথেষ্ট নজর দিতে পারছে না। দাতা সংস্থাগুলোর নানা ধরণের শর্তের কারণে সরকারকে হিসাব করে চলতে হচ্ছে। যা শেয়ারবাজারের অগ্রগতিকেও অক্টোপাসের মতো আঁকড়ে ধরেছে। কারণ, শর্ত বাস্তবায়ন করলে একদিকে যেমন শেয়ারবাজার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে অন্যদিকে শর্তপূরণ না হলে দাতা সংস্থাগুলো মুখ ফিরিয়ে নেবে। এজন্য সদিচ্ছা থাকার পরও দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে সরকার সরাসরি হস্তক্ষেপ করতে পারছে না।

তবে সম্প্রতি দেখা গেছে, ব্যাংকগুলো নিজস্ব প্রয়োজনে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ কিছুটা বাড়িয়েছে। বাজারে যদি ব্যাংকসহ প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীরা ধারাবাহিকভাবে বিনিয়োগ বাড়াতে থাকে তবে বাজার খুব দ্রুত স্বাভাবিক হয়ে আসবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করেন।

অর্থ বাণিজ্য