নেতা-কর্মীদের মৃত্যু: শোকবাণী আর সমবেদনাতেই দায় শেষ বিএনপির!

নেতা-কর্মীদের মৃত্যু: শোকবাণী আর সমবেদনাতেই দায় শেষ বিএনপির!

শোকবাণী আর সমবেদনাই যেন হয়ে উঠেছে প্রয়াত বিএনপি নেতা-কর্মীদের অমোঘ নিয়তি। দলের জন্য প্রতিপক্ষের হাতে মৃত্যুর পর ক’টা দিন খোঁজখবর নিচ্ছেন তার রাজনৈতিক সতীর্থ, কেন্দ্রীয় নেতারা। এরপর বিস্মৃতির অতল গহবরে হারিয়ে যাচ্ছেন তারা।

বছরের পর বছর পেরিয়ে গেলেও এসব নেতার পরিবারের খোজঁ খবর নেয় না কেউই। এমন কি নিহত ব্যক্তির স্মরণসভাটুকুও হয় না দলের জন্য জীবন বিসর্জন দেওয়া অধিকাংশ নেতার।

গত চার বছরে বিএনপির রাজনীতি করতে এসে বিভিন্নভাবে জীবন দিতে হয়েছে শতাধিক নেতা- কর্মীকে। এ ছাড়া গত ৩৪ বছরে রোগে মারা গেছেন অসংখ্য নেতা-কর্মী। এদের মধ্যে তৃণমূলের অচেনা নিবেদিত নেতা থেকে শুরু করে মুখ চেনা কেন্দ্রীয় নেতারাও রয়েছেন। তাদের স্বজনহারা পরিবারগুলো কেমন আছে, সে খোঁজ নেওয়ার কোন দায়ই যেন নেই দলের।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, পুলিশের গুলিতে গত ২৯ জানুয়ারি নিহত হন লক্ষ্মীপুরের রুবেল ও আবুল কাশেম। ২০১০ সালের ৮ অক্টোবর রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের হাতে প্রকাশ্যে নির্মমভাবে নিহত হন নাটোরের বড়াই গ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান সানাউল্লাহ বাবু।

গত ২৪ আগস্ট গুলি করে হত্যা করা হয় রাজবাড়ী জেলা যুবদলের সাবেক আহবায়ক এম সামসুল আলম বাবুকে।

নিহত সামসুল আলম বাবুর ছোট ভাই শহিদুল ইসলাম বলেন, “দল থেকে কেবল শোকবাণী আর বিবৃতি দিয়েছে। জেলার নেতারা খোঁজ-খবর নিয়েছে। এখন সবাই চুপ।”

কেন্দ্র থেকে কেউ খোঁজ নিয়েছে কি না জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিএনপির মহাসচিব বা অন্য কোন বড় নেতা খোজঁ নেয় নি। তবে শুনেছি রাজবাড়ি জনসভায় এলে ম্যাডাম (খালেদা জিয়া) আমাদের বাড়িতেও আসবেন।”

ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর আন্দোলন করতে গিয়ে বিশ্বনাথে ২ বিএনপি নেতাকে জীবন দিতে হয়েছে নির্মমভাবে।

এ ছাড়া ২০১০ সালের ১৮ এপ্রিল খালেদা জিয়ার জনসভায় যোগ দিতে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনায় জীবন দিতে হয় ১০ জনকে। একই দিন প্রতিপক্ষের হামলায় আরও তিনজন নিহত হন।

নিহতরা হলেন- লোহাগাড়া উপজেলার ধোপদাহ গ্রামের তুরান ও মফিজুর রহমান, বসুপটি গ্রামের সাহেব আলী ও অবুজ, গণ্ডব গ্রামের নাজির, জিএম ও এনামুল। পদ্মাবিলা গ্রামের ফয়েজ। ভাট গাতি গ্রামের আক্তার হোসেন ও রামেস্বর গ্রামের নুর ইসলাম।

এছাড়া সমাবেশে থেকে ফেরার পথে নড়াইলে ১৩ জন বিএনপি নেতা-কর্মী নিহত হয়।

এভাবে সারাদেশে গত পৌনে চার বছরে এ দলটির প্রায় শতাদিক নেতা-কর্মী নিহত হয়েছেন বলে বিভিন্ন সমা-সমাবেশে দাবি করেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর।

নড়াইলের বসুপটি গ্রামের সাহেব আলীর ভাতিজা নায়েব আলী বলেন, “মারা যাওয়ার পর স্থানীয় বিএনপি নেতা কর্মীরা এসেছেন। বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা তরিকুল ইসলাম খোঁজ নিয়েছেন। তবে এখন আর কেউ খোঁজ নেয় না এটা ঠিক। সবাই যার যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত।”

তিনি বলেন, “এখন আর খোঁজ নেয় না তেমন একটা কেউ। তবে এ ঘটনার পর বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও মহাসচিব শোকবাণী দিয়েছেন।”

জানা যায়, ২০১০ সালের ১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদের মুলবাড়ি রেল-ক্রসিং-এ খালেদা জিয়ার জনসভায় আসার পথে ট্রেন ট্রাজেডিতে মারা যায় জেলার এনায়েতপুর থানার বেলতলী গ্রামের আবুল হাসানাতের ছেলে ঠাণ্ডু মিয়া, কামারখন্দ উপজেলার হালুয়া কান্দি গ্রামের আবুল নায়েবের ছেলে ফারুক তালুকদার, কামারখন্দ উপজেলার বালুকোল গ্রামের নুরন্নবী, সদর উপজেলার হাসনা গ্রামের মৃত মির্জা মফিজ আলীর ছেলে মির্জা শাবান আলী (৬০), সদর উপজেলার হাসনা গ্রামের মৃত মরম আলীর ছেলে সুরতজ্জামান (৬০), রেল কর্মচারী আব্দুল হাই ও টাঙ্গাইল জেলার গোপালপুর উপজেলার কামার কুমুলদী গ্রামের আব্দুল বাছেদ।

১১ অক্টোবর সিরাজগঞ্জের সয়দাবাদের মুলবাড়ি রেল-ক্রসিং-এ নিহত মির্জা শাবান আলীর ছেলে সদর উপজেলার বাগবাটি ইউনিয়নের মেম্বার মির্জা শামীম জানান, তার বাবা নিহত হওয়ার পর বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়ার পক্ষে স্থানীয় এমপি কিছু আর্থিক সাহায্য দেন।

তিনি বলেন, “এখন আর তেমন একটা খোজঁ খবর আর কেউই নেয় না। স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের সঙ্গে দেখা হলে হয়তো কুশল বিনিময় করেন। তবে কেউই আর বাবার খোজঁ নেয়নি। তাই দলীয়ভাবে নয়, পারিবারিকভাবে বাবার মুত্যুবার্ষিকী পালন করি।”

একই ঘটনায় নিহত সুরতজ্জামানানের মেয়ে রানীয় খাতুন বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর টুকুর স্ত্রী এসে কিছু আর্থিক সাহায্য দিয়ে গেছেন। এর পর বিএনপির কোন লোক আর বাবার খোঁজ নেয়নি।”

তার পরিবার কেমন আছে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার পর আর্থিকভাবে ভাল নেই।”

তিনি বলেন, “বাবা থাকতে যেভাবে আসত খোঁজ খবর নিতে, এখন আর কেউই খবর নেয় না।”

নাটোরের বড়াই গ্রাম উপজেলা চেয়ারম্যান বাবুর স্ত্রী মহুয়া নূর কচির মা সৈয়দা মাজেদা বেগম  বলেন, “ভাল আছি আমরা। মেয়ের (মহুয়া) এলএলবি পরিক্ষা চলে। এ নিয়েই এখন চিন্তিত।”

সৈয়দা মাজেদা আরও বলেন, “ভালো আছি, তবে চিন্তা তো হচ্ছেই। বাবু মারা যাওয়ার পর থেকে আমার মেয়ের পরিবার অসহায় হয়ে গেছে।”

তিনি বলেন, “বাবু মারা যাওয়ার পর বিএনপি নেত্রী তাদের দেখতে এসেছিলো। বাবু নেই বলে এখন আর আগের মত সেই রকম কেউ আসেও না। খোজঁ খবর দু’একজন নেয় ফোনে।”

লক্ষ্মীপুরে নিহত রুবেলের পিতা বাহার ড্রাইভার বলেন, “খালেদা জিয়া আমাদের বাড়িতে এসেছিলেন। কিছু টাকা সাহায্যও করেছেন। এর পর আর কেউ খোজঁ নেয় নি।”

তিনি বলেন, “কেউ খোঁজ না নিলেও এ নিয়ে কোন কষ্ট নেই। সব কিছুই আল্লাহর উপর ছেড়ে দিয়েছে।”

নিহত আবুল কাশেমের ছেলে রাজু বলেন, “বাবা মারা যাওয়ার  পর কিছু আর্থিক সাহায্য পেয়েছি। তবে এখন আর কেউ খোজঁ নিচ্ছে।”

বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আরীর গুম হওয়ার পর হরতালসহ নানা কর্মসূচি দিলেও বেশ কিছু দিন ধেরে কেউ ফোনেও খোঁজ নেয় না তাদের।

তবে দলটির মহাসচিব ইলিয়াস আলীর মেয়ের জন্মদিনে ও ঈদের দিনে ইলিয়াস আলীর বাসায় যান এবং পরিবারে সদস্যদের খোজঁ খবর নেন।

যাশোর জেলা বিএনপির অর্থ সম্পাদক নাজমুল ইসলাম গুম হওয়ার পর তার লাশ উদ্ধার হয় গাজীপুর থেকে। মারা যাওয়ার পর শোকবাণী ও শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানানো ছাড়া কেন্দ্র থেকে কিছুই করা হয় নি তার জন্য। ধরা পড়েনি হত্যাকারীরা। বিরোধী দল করার কারণে পাচ্ছে না বিচারও। এভাবেই কষ্ট নিয়ে বাকি জীবন কাটাতে হবে যশোরের এই নেতার পরিবারের সদস্যদের।

এছাড়া স্বাভাবিক মৃত্যুর শিকার হওয়া ত্যাগী নেতাদেরও মনে রাখছে না দল। এমনকি বছরান্তে স্মরণসভাটুকুও আয়োজন করা হচ্ছে না দলীয়ভাবে।

সম্প্রতি বৃদ্ধ বয়সে মারা যাওয়া বিএনপির স্থায়ী কমিটির সাবেক সদস্য আব্দুল মতিন চৌধুরীকে যেন অল্প সময়ের মধ্যেই ভুলে গেছে সবাই। বিএনপিতে তার অনেক অনুসারী থাকলেও কেউই মনে রাখেনি তার কথা।

বছর খানেক আগে মারা গেছেন বিএনপির প্রতিষ্ঠাতা জিয়াউর রহমানের সামরিক জীবনের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ও বিএনপির ভাইস-চেয়ারম্যান জেনারেল মীর শওকত আলী। তার দ্বিতীয় মৃত্যুবার্ষিকীতে একটা স্মরণসভাও আয়োজন করেনি দল।”

ক’বছর আগে মারা যাওয়া সাবেক অর্থমন্ত্রী সাইফুর রহমানকেও যেন ভুলে গেছেন সবাই। তার মৃত্যুবার্ষিকীটাও পালন করা হচ্ছে দায়সারাভাবে।

একইভাবে বিএনপির সাবেক মহাসচিব ওবায়দুর রহমান ও সালাম তালুকদারের মৃত্যুবার্ষিকীও অনেকটা দায়সারা ভাবেই পালন করা হয়।

বাংলাদেশ