বুয়েটে ক্লাস শুরু শনিবার, এবার ক্ষতি পোষানোর পালা

বুয়েটে ক্লাস শুরু শনিবার, এবার ক্ষতি পোষানোর পালা

দীর্ঘ ৫ মাসের অচলাবস্থা কাটিয়ে শনিবার খুলছে বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়(বুয়েট)।

উপাচার্য, উপ-উপাচার্য অপসারণ ও প্রশাসনের বিভিন্ন অনিয়মের বিরুদ্ধে আন্দোলনরত শিক্ষকদের দীর্ঘ সময় ধরে ক্লাস বর্জনের কারণে বুয়েটের শিক্ষার্থীদের একাডেমিক কার্যক্রমের ক্ষতি কিভাবে পুষিয়ে নেওয়া যায়, সেটিই এখন ভাবনার বিষয় সরকার ও বুয়েট কর্তৃপক্ষের।

শিক্ষানুরাগী, অভিভাবকসহ দেশের সকল মানুষই আশা করছেন, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ব্যস্ততায় বুয়েটের ক্লাসগুলোতে ফিরে আসবে প্রাণ। ডায়াসে আবার দাড়াবেন শিক্ষক, বেঞ্চে বসবেন শিক্ষার্থী।

উপাচার্য অধ্যাপক এস এম নজরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, আমাদের বুয়েট পরিবারের সকলেই বিশ্বাস করি নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রমের মধ্যে আমরা ফিরে আসতে পেরেছি। এরইমধ্যে ক্লাস রুটিন করা হয়েছে। শনিবার সকাল থেকেই ক্লাস কার্যক্রম শুরু হবে। শিক্ষকদের সঙ্গে আমার কথা হয়েছে, উনারা ক্লাসে যাবেন। শিক্ষার্থীরাও ক্লাসে ফেরার অপেক্ষায়।

উপাচার্য আরো জানান, আশা করি নিয়মিত ক্লাস কার্যক্রম পরিচালনা করলেই আমাদের বিগত দিনগুলোর ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে।

এদিকে শিক্ষকরাও শনিবার থেকে নিয়মিত ক্লাসে যাবেন বলে জানিয়েছেন শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মুজিবুর রহমান।

তিনি বলেন, শনিবার থেকেই ক্লাসে যাবেন শিক্ষকরা। শিক্ষক-শিক্ষার্থী মিলেই সহযোগিতার মাধ্যমে বুয়েটকে সামনের দিকে এগিয়ে নিয়ে যাবে।

সাম্প্রতিক আন্দোলনের ব্যাপারে মুজিবুর রহমান বলেন, শিক্ষামন্ত্রী, শিক্ষা সচিব আমাদের যেসব আশ্বাস দিয়েছিলেন সেগুলোর বাস্তবায়ন হচ্ছে। এরইমধ্যে উপ-উপাচার্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে এবং শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল সেগুলো প্রত্যাহার করা হয়েছে। এছাড়াও আন্দোলনরত শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অন্য দাবিগুলো বাস্তবায়ন হবে বলেও আশা করি।

এর আগে  গত সোমবার সকালে অনুষ্ঠিত ডিনস কমিটির সভায় ক্লাস শুরুর লক্ষ্যে প্রাথমিকভাবে একটি একাডেমিক ক্যালেন্ডারও তৈরি করা হয়েছে। শিক্ষার্থীরা এই একাডেমিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ক্লাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।

উপাচার্য অধ্যাপক নজরুল ইসলাম জানান, যেদিন থেকে ক্লাস শুরু হবে, সেদিন প্রথম দিন ধরে একাডেমিক ক্যালেন্ডার হবে।

গত রোববার এক প্রজ্ঞাপনে উপ-উপাচার্যকে অপসারণের পর শিক্ষামন্ত্রীর প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে করা মামলা দুটিও প্রত্যাহার করা হয়েছে।

আন্দোলনে নেতৃত্বদানকারী শিক্ষার্থী মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের শেষ বর্ষের ছাত্র সুদীপ্ত সাহা বলেন, শনিবার থেকে ক্লাস শুরু হবে বলে জানানো হয়েছে।

এদিকে ক্লাস শুরুর আগে গত বৃহস্পতিবার বুয়েট ঘুরে দেখা যায়, শিক্ষার্থীরা এখন বেশ ফুরফুরে মেজাজে রয়েছে। ক্যাফেটেরিয়া, শহীদ মিনার চত্বর শিক্ষার্থীদের আড্ডায় প্রাণবন্ত। এরই মধ্যে প্রায় সকল শিক্ষার্থীরাই হলে ফিরে এসেছে।

বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, প্রায় ৫ মাস ধরেই তাদের ক্লাস কার্যক্রম অনিয়মিত ছিল। এ নিয়ে তাদের মনে ক্ষোভ ও হতাশার সৃষ্টি হয়েছে।

বুয়েটের পুরকৌশল বিভাগের এক শিক্ষক বলেন, বর্তমানে এই শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ছয় মাসের সেশনজট লেগে আছে। এমনিতেই চার বছরের সম্মান কোর্স শেষ করতে সাড়ে চার বছরের মতো সময় লেগে যাচ্ছে। আর এখন এ জট আরও বেড়েছে।

তিনি বলেন, গত এপ্রিল থেকেই বুয়েটের শিক্ষা কার্যক্রম কার্যত অচল হয়ে আছে। ফলে সৃষ্ট সেশনজটে বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের একাডেমিক সেশন ধরতে পারবেন না বুয়েটের শিক্ষার্থীরা। নভেম্বরের মধ্যে পরীক্ষা ও ফল প্রকাশ সম্পন্ন না হলে বুয়েটের শিক্ষার্থীরা দেশের বাইরের বিশ্ববিদ্যালয়ের সামার সেশন ধরতে পারবেন না।

যন্ত্রকৌশল বিভাগের ০৭ ব্যাচের এক শিক্ষার্থী বলেন, ‘এ সময়টায় আমাদের ফাইনাল পরীক্ষা শেষে চাকরিতে থাকার কথা। কিন্তু দীর্ঘ সংকটের কারণে এখনো আমাদের ক্লাস শেষ হয়নি। পরীক্ষাতো দূরের কথা।’

সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের ২য় বর্ষের এক শিক্ষার্থী জানান, গতবছর যেসব শিক্ষার্থী ভর্তি হয়েছিল তাদের এখন দ্বিতীয় টার্ম পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা ছিল। অথচ এখনো তারা প্রথম টার্ম পরীক্ষা দিতে পারেন নি।

এদিকে এখনো নির্ধারণ হয়নি ২০১২ সালের প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষার সময়। উচ্চ মাধ্যমিকে বিজ্ঞান বিভাগ থেকে উত্তীর্ণ মেধাবীদের বড় একটি অংশ ভর্তি হন বুয়েটে। বিগত বছরগুলোতে সবার আগে বুয়েটের ভর্তি কার্যক্রম শুরু হতো। এর ফলে ইঞ্জিনিয়ারিং এ পড়তে ইচ্ছুক বিজ্ঞান বিভাগের সেরা মেধাবীদের ঘরে তুলতে পারতো বুয়েট। সেখানে এ বছর ভর্তিপ্রক্রিয়াও শুরু করতে পারেনি কর্তৃপক্ষ।

নিয়মানুযায়ী প্রথম বর্ষ ভর্তি পরীক্ষা গ্রহণের জন্য সবার আগে ডিন ও বিভাগীয় প্রধানদের সঙ্গে কথা বলে একাডেমিক কাউন্সিলের সভা ডাকতে হয়। কিন্তু আন্দোলনরত শিক্ষকেরা বর্তমান উপাচার্যের ডাকা বৈঠকে না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। ফলে একাডেমিক কাউন্সিলের সভাও অনুষ্ঠিত হয়নি। কয়েক দফায় এ সভার তারিখ ঠিক করা হলেও শেষ পর্যন্ত অনুষ্ঠিত হয়নি।

উপাচার্য নজরুল ইসলাম আশা প্রকাশ করে বলেন, শনিবার ক্লাস কার্যক্রম শুরু করলেই ধীরে ধীরে ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়া যাবে। শিক্ষক-শিক্ষার্থী সকলেই চেষ্টা করবেন।

১ম বর্ষ ব্যাপারে তিনি বলেন, শিগগিরই ভর্তি প্রক্রিয়ার ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

উল্লেখ্য, বুয়েটের উপাচার্য এস এম নজরুল ইসলাম ও উপ উপাচার্য হাবিবুর রহমানের অপসারণ বা পদত্যাগের দাবিতে গত ৭ এপ্রিল থেকে আন্দোলন করে আসছিল বুয়েট শিক্ষক সমিতি।

মে মাসে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে আন্দোলন সাময়িকভাবে স্থগিত করে সমিতি। দাবি পূরণ না হওয়ায় গত ১৪ জুলাই থেকে আবার লাগাতার কর্মসূচি পালন করা হয়। এরই মধ্যে উপাচার্য হঠাৎ করেই ৪৪ দিনের জন্য বুয়েট বন্ধ ঘোষণা করেন।

পরে শিক্ষক সমিতির আন্দোলনে ছাত্র-ছাত্রী, কর্মকর্তা, কর্মচারীরাও অংশ নেন। ৩১ জুলাই উচ্চ আদালত আন্দোলনের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে শিক্ষক সমিতি আন্দোলন স্থগিত করলেও শিক্ষকেরা ক্লাস নেওয়া থেকে বিরত থাকেন। ঈদের পর ২৫ আগস্ট বুয়েট খুললেও এখন পর্যন্ত কোনো কাস হয়নি। শিক্ষার্থীরা ভিসি-প্রোভিসির অপসারণের দাবিতে অনড় থাকেন।

পরে গত ৩ সেপ্টেম্বর শিক্ষক সমিতি ও ৫ সেপ্টেম্বর শিক্ষার্থীদের সঙ্গে বসেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি উপ উপাচার্যকে প্রত্যাহারের ঘোষণা দেন, তবে উপাচার্যের ব্যাপারে পরে সিদ্ধান্ত হবে বলে জানান।

পরে শিক্ষার্থীরা সংবাদ সম্মেলন করে শিক্ষকদের দেওয়া শিক্ষামন্ত্রীর গুচ্ছ প্রস্তাবের মধ্যে তিনটি পূরণ করা হলে কাসে ফিরবেন বলে ঘোষণা দেন। দাবিগুলো পূরণ হতে শুরু করায় গত ১১ সেপ্টেম্বর শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা একসঙ্গে কাসে ফেরার ঘোষণা দেন। এর ফলে বুয়েট সঙ্কটের আপাতত সমাধান হলো বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।

বাংলাদেশ