ডাইরেক্ট সেল আইন চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিসভা কমিটিতে যাচ্ছে রোববার

ডাইরেক্ট সেল আইন চূড়ান্ত খসড়া মন্ত্রিসভা কমিটিতে যাচ্ছে রোববার

মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির ব্যবসা নিয়ন্ত্রণে বহুল আলোচিত ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১২’- এর চূড়ান্ত খসড়া অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হচ্ছে আগামীকাল রোববার। এর আগে আইনটি মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হলেও এটি আরো পর্যালোচনার জন্য পুনরায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠানো হয়। পর্যালোচিত ও সংশোধিত এ চূড়ান্ত খসড়াটিই আবার পাঠাচ্ছে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়। মন্ত্রিপরিষদ এটি অনুমোদন করলে সংসদের আগামী অধিবেশনেই আইনটি বিল আকারে উপস্থাপন করা হবে।

এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে বাণিজ্য সচিব মো. গোলাম হোসেন বলেন, “আইনটি কালই (রোববার) মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হবে।”

তিনি বলেন, “আইনটি ইতোপূর্বে মন্ত্রিসভা কমিটিতে পাঠানো হয়েছিল। কিন্তু কিছু বিষয় আরো পর্যালোচনা ও সংশোধনের জন্য তা ফেরত পাঠায় কমিটি। পরবর্তীতে আইনটির বিষয়ে অর্থ মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় ও সচিব কমিটির মতামত নিয়ে কিছুটা সংশোধনী আনা হয়েছে। বাণিজ্যমন্ত্রী জিএম কাদের এতে অনুমোদন দিয়েছেন।”

বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, মালয়েশিয়া, যুক্তরাজ্য, ভারত, চীন ও কানাডাসহ বিভিন্ন দেশে ‘মাল্টি লেভেল মার্কেটিং’ (এমএলএম) ব্যবসা পরিচালনার জন্য সুনির্দিষ্ট আইন ও নীতিমালা রয়েছে। কিন্তু বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো আইন না থাকায় বিতর্কিত ও প্রতারণামূলক ব্যবসা হিসেবে অভিযুক্ত এমএলএম কোম্পানিগুলো উচ্চ মুনাফার লোভ দেখিয়ে জনসাধারণকে বিনিয়োগে আকৃষ্ট করে হয়রানি ও প্রতারণা করছে। অনেক কোম্পানি গচ্ছিত অর্থ আত্মসাৎ করে নিরীহ জনসাধারণকে সর্বস্বান্ত করছে। এ পরিপ্রেক্ষিতে এমএলএম কোম্পানিগুলোর ব্যবসায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা আনার লক্ষ্যে তাদের একটি আইনী কাঠামোর আওতায় নিয়ে আসার জন্য ‘ডাইরেক্ট সেল’ আইনটি প্রণয়ন করা হচ্ছে।

রেজিস্ট্রার জয়েন্ট স্টক কোম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তর থেকে প্রাপ্ত তথ্য মতে, বর্তমানে প্রায় ৭০টি নিবন্ধিত কোম্পানি এমএলএম কার্যক্রম পরিচালনা করছে। এছাড়া রেজিস্ট্রেশন বহির্ভূত অনেক কোম্পানি এমএলএম ব্যবসা পরিচালনা করছে।

কী আছে খসড়া ডাইরেক্ট সেল আইনে:
সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ডের বিধান রেখে ‘ডাইরেক্ট সেল আইন-২০১১’-এর খসড়া চূড়ান্ত করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত এ আইনে কোনো মাল্টি লেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) কোম্পানির পিরামিড সদৃশ বিক্রি কার্যক্রম, অবস্তুগত বা অলীক পণ্য, পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিপণনযোগ্য হবে এমন পণ্যর বিক্রি নিষিদ্ধ করা হয়েছে। আইন ভঙ্গকারীকে সর্বোচ্চ ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০ লাখ টাকা জরিমানা করা হবে। নতুন ও বিদ্যমান সকল এমএলএম কোম্পানিকে আইনটির আওতায় নতুন করে লাইসেন্স নিতে হবে।

প্রস্তাবিত ডাইরেক্ট সেল আইনে মোট ১৩টি অধ্যায়, ৫০টি ধারা এবং দুটি তফসিল রয়েছে। আইনের তৃতীয় অধ্যায়ে নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষ, চতুর্থ অধ্যায়ে লাইসেন্স প্রদান সংক্রান্ত বিষয়াদি, পঞ্চম অধ্যায়ে ব্যবসা নিষিদ্ধকরণ, ষষ্ঠ অধ্যায়ে অপরাধ ও দণ্ড এবং সপ্তম থেকে দশম অধ্যায়ে পরিবীক্ষণ-তদারকি, নিয়ন্ত্রকের আদেশ, চুক্তি সম্পাদান, পণ্যের বাস্তব উপস্থিতি ইত্যাদি বিষয় উল্লেখ রয়েছে।

প্রস্তাবিত এই আইনের ধারা ১১ অনুসারে ডাইরেক্ট সেল (এমএলএম) ব্যবসা পরিচালনার জন্য নির্দিষ্ট দলিলপত্রসহ লাইসেন্সের জন্য আবেদন করতে হবে। লাইসেন্স প্রাপ্তির পর কোম্পানি আইন ১৯৯৪-এর আওতায় নিবন্ধন নিতে হবে। যেসব কোম্পানি আলোচ্য আইন জারির পূর্ব থেকেই ডাইরেক্ট সেল ব্যবসায় জড়িত, তাদেরকও আইন জারির ৯০ দিনের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে লাইসেন্স গ্রহণ করতে হবে। এই আইনের কোনো ধারা লঙ্ঘন করা হলে অপরাধী কোনো ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানকে ৩ থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং অনধিক ৫০ লাখ টাকা অর্থদণ্ড করা যাবে।

ডাইরেক্ট সেল আইনে, এ ব্যবসায় পণ্যে মোড়ক ব্যবহার বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। মোড়কে উৎপাদক, ওজন পরিমাপ, উপাদান, ব্যবহারবিধি, সর্ব্বোচ্চ খুচরা মূল্য, উৎপাদন মোড়কজাতকরণ ও মেয়াদ উর্ত্তীণের তারিখ লিবিপদ্ধ থাকতে হবে। কোনো ক্রেতাকে মিথ্যা বিজ্ঞাপন ও তথ্য দিয়ে প্রতারিত করা হলে এক থেকে ৫ বছরের কারাদণ্ড এবং প্রতারিত ব্যক্তির আর্থিক ক্ষতির দ্বিগুণ অর্থদণ্ড করা যাবে বলে বলা হয়েছে। কোনো ব্যক্তি এমএলএম কোম্পানির ধার্যকৃত মূল্যের অধিক মূল্যে পণ্য বা সেবা বিক্রি করলে তাকেও ৬ মাস থেকে এক বছরের কারাদণ্ড অথবা অনধিক ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত অর্থদণ্ড করা হবে। এ ব্যবসায় জড়িত সকল কোম্পানিকে বার্ষিক একটি প্রতিবেদন বছর শেষ হবার তিনমাসের মধ্যে নিয়ন্ত্রকের কাছে জমা দিতে হবে।

আইনের বাস্তবায়ন হবে যেভাবে
আইনটি বাস্তবায়নের জন্য ঢাকায় একটি পরিদপ্তর স্থাপন করা হবে এবং এর প্রধান হিসেবে থাকবেন একজন নিয়ন্ত্রক। নিয়ন্ত্রক ডাইরেক্ট সেল কার্যক্রম পরিচালনার জন্য লাইসেন্স প্রদান, লাইসেন্স বাতিল, স্থগিত ও পুনর্বহাল করতে পারবেন।

ডাইরেক্ট সেল আইনে যেসব ব্যবসা নিষিদ্ধ
বাণিজ্য মন্ত্রণালয় সূত্রমতে, ডাইরেক্ট সেল আইনের খসড়ায় এমএলএম কোম্পানিগুলোর জন্য ২১ ক্যাটাগরির ব্যবসাকে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে: (১) অবস্তুগত বা অলীক পণ্য এবং সময়ের ধারাবাহিকতা বা পর্যায়ক্রমিক প্রক্রিয়াকরণের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিপণনযোগ্য হবে এমন পণ্য বা সেবা; (২) স্থাবর সম্পত্তি যেমন- জমি, বাড়ি, ফ্ল্যাট, দোকান বা অফিস স্পেস, গাছ ইত্যাদি; (৩) সমবায় পদ্ধতির খামার বা সমিতি বা ব্যবসা এবং ব্যাংক, বীমা, লিজিং কোম্পানি ইত্যাদি আর্থিক প্রতিষ্ঠান; (৪) কমিশন বা বোনাস হিসাবে কোনরূপ শেয়ার বা ঋণপত্র ক্রয়-বিক্রয়; (৫) সকল প্রকার সঞ্চয়পত্র, বোনাস স্কিম, কিস্তির মাধ্যমে অর্থ সংগ্রহ বা সঞ্চয় বা বিলিবণ্টন; (৬) লটারির টিকিট; (৭) প্লাটিনাম, স্বর্ণ, ব্রোঞ্জ, পারদ; (৮) হাইড্রো কার্বন, পরিবেশ ও স্বাস্থ্য বিপন্নকারী পদার্থ, (৯) তেজস্ক্রিয় পদার্থ, (১০) এসিড ও স্পর্শকাতর রাসায়নিক পদার্থ, (১১) অস্ত্র ও বিস্ফোরক পদার্থ; (১২) ধাতব মুদ্রা; (১৩) মাদক দ্রব্য ও তামাক জাতীয় দ্রব্য, নিষিদ্ধ ঘোষিত ওষুধ; (১৪) খাদ্য ব্যবহার্য ক্ষতিকর রঙ; (১৫) ভেজাল মিশ্রিত দ্রব্য/পণ্য; (১৬) মেয়াদোত্তীর্ণ, অচল, বিষাক্ত ও নষ্ট পণ্য; (১৭) আমদানি নিষিদ্ধ পণ্য ও বিদেশ থেকে চোরাই পথে  আসা পণ্য; (১৮) অশ্লীল ছবির ফিল্ম, সিডি, ভিসিডি, (১৯) উগ্র মৌলবাদী বই, ফিল্ম, সিডি, ভিসিডি; (২০) রাষ্ট্র ও ধর্ম বিরোধী বা ধর্ম বিকৃতকারী বই, প্রচারপত্র, ফিল্ম, সিডি, ভিসিডি এবং (২১) সরকার কর্তৃক বা আইন দ্বারা বিক্রয় বা সরবরাহ নিষিদ্ধকৃত অন্য যে কোনো পণ্য।

অর্থ বাণিজ্য