আরও একটি মিথ্যা মামলায় লিমনের পরিবার!

আরও একটি মিথ্যা মামলায় লিমনের পরিবার!

আরও একটি মিথ্যা ‌‌মামলায় জড়ানো হলো র‌্যাবের গুলিতে পা হারানো কলেজছাত্র লিমনের পরিবারকে।

হৃদরোগে মারা যাওয়া ব্যক্তিকে পুঁজি করে লিমনের মা-ভাই ও বাবাসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন লিমন।

যেভাবে এ মামলা সাজানো হয়-
ঈদের দিন সোমবার (২০ আগস্ট) বিকেল সাড়ে ৫টা। লিমন ঈদ করতে পিরোজপুরের কাউখালী ভাড়া বাসা থেকে রাজাপুরের সাতুরিয়া গ্রামে ‍আসেন। ঈদ উদযাপন শেষে মা ও ভাইকে নিয়ে ভাড়া বাসায় ফিরছিলেন লিমন।

এ সময় সাতুরিয়া গ্রামের ইঁদুরবাড়ি এলাকায় পৌঁছালে র‌্যাবের সোর্স হিসেবে পরিচিত সাতুরিয়া গ্রামের আ. রশিদের ছেলে ইব্রাহিম তাদের গতিরোধ করেন।

ইব্রাহিম তখন লিমনকে বলেন,‍ “তুই এ গ্রামে আইছিস কেন? তোকে না এখানে আসতে বারণ করেছি” এ কথা বলেই ইব্রাহিম লিমনকে চড়-থাপ্পড় মারতে থাকেন।

এ সময় ছেলেকে মারতে দেখে মা হেনোয়ারা বেগম(৪০) ও বড় ভাই সুমন (২৫) এগিয়ে এলে তাদেরকেও বেধড়ক মারপিট করেন ইব্রাহিম।

এতে লিমনের মা ও ভাই আহত হন। পরে এলাকাবাসী এসে তাদের উদ্ধার করে রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে লিমনের মাকে ভর্তি করেন। সেদিন লিমন ও তার ভাইকে প্রাথমিক চিকিৎসা দেওয়া হয়।
এ দিন রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের আবাসিক মেডিক্যাল অফিসার ডা. মোহাম্মদ আবুল খায়ের মাহমুদ রাসেল ফোনে ঢাকা অফিসকে জানিয়েছিলেন, “লিমনের তেমন সমস্যা নাই। তাকে চড়-থাপ্পড় মারা হয়েছে। কিন্তু, ওর মায়ের ঘাড়ে আঘাত রয়েছে। তার বাম ভ্রুয়ের ওপরে ফুলে গেছে। বোধ হয়, ঘুষি লেগেছে। মাথার দুই পাশেও আঘাতের চিহ্ন রয়েছে। ঘুষি অথবা ভোতা কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে বলে মনে হচ্ছে।”

অপরদিকে,  ইব্রাহিম ততটা আহত হননি বলে মন্তব্য করেন তিনি।

এদিকে, লিমনরা যখন রাজাপুর রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অবস্থান করছিলেন তখন লিমনদের ওপর হামলাকারী ইব্রাহিমের শ্যালক ফোরকান সাতুরিয়া গ্রামে হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে মারা যান। এ মৃত্যুর খবর পেয়ে রাজাপুর থানা ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা তোফাজ্জেল হোসেনসহ পুলিশ ও র‌্যাবের কর্মকর্তারা ইব্রাহিমদের বাড়িতে উপস্থিত হন।

ওই দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত রাজাপুর থানার উপপরির্শক(এসআই)হালিম তালুকদার ঢাকা অফিসকে জানিয়েছিলেন, “ফোরকানের মৃত্যু নিয়ে নানামুখি গুঞ্জন হচ্ছে। এখানকার কেউ বলছেন, তিনি হৃদরোগে মারা গেছেন। আবার ইব্রাহিমের পরিবার বলছেন, তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছে লিমনের মা-ভাই ও ‍তার সহযোগীরা। তবে এ অভিযোগ মৌখিক, লিখিতভবে নয়।

অপরদিকে, এ দিন রাতেই রহস্যজনকভাবে ইব্রাহিম রাজাপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হন।

ঈদের পরদিন মঙ্গলবার (২১ আগস্ট) লিমন, তার মা ও ভাইকে মারপিটের ঘটনায় রাজাপুর থানায় পাল্টাপাল্টি লিখিত অভিযোগ দায়ের করা হয়।

র‌্যাবের সোর্স ইব্রাহিমের বিরু্দ্ধে লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম। অপরদিকে, স্বামী ইব্রাহিমকে মারপিটের অভিযোগ এনে লিমনদের বিরুদ্ধে অভিযোগ দায়ের করেন ইব্রাহিমের স্ত্রী লিলি বেগম।

লিখিত অভিযোগে লিমনের মা উল্লেখ করেন, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টার দিকে পিরোজপুরের কাউখালীতে যাওয়ার পথে ইঁদুরবাড়ি এলাকায় তাদের গতিরোধ করে ছেলে লিমন ও সুমন এবং তাকে মারপিট করে সাতুরিয়া গ্রামের রশিদের ছেলে ইব্রাহিম। এতে তার দুই ছেলেসহ তিনি আহত হন।

পরে এলাকাবাসী তাদের উদ্ধার করে লিমনের মাকে রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করেন। তিনি এখনও সেখানে চিকিৎসাধীন। অভিযোগপত্রে তিনি আরও উল্লেখ করেন, দুই ছেলেকে নিয়ে তিনি বর্তমানে নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। ফের হামলার আশঙ্কা করছেন তিনি।

অপরদিকে, প্রতিপক্ষ ইব্রাহিমের স্ত্রী লিলি বেগম তার অভিযোগপত্রে উল্লেখ করেন, লিমন ও তার ভাই সুমন এবং মা হেনোয়ারা মিলে তার স্বামীকে  মারপিট করেছেন। এতে তার স্বামী ইব্রাহিম আহত হয়ে সোমবার রাতে রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি হয়েছেন।

ঈদের দ্বিতীয় বুধবার (২২ আগস্ট) পরিবার ও নিজের জীবনের নিরাপত্তা চেয়ে থানায় লিখিত আবেদন করেন লিমন। তবে তার ওই লিখিত আবেদন জিডি হিসেবে রেকর্ড করা হয়নি বলে বাংলানিউজকে জানান, রাজাপুর থানার ওসি তোফাজ্জেল হোসেন।

বুধবার দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে জেলার রাজাপুর থানায় তিনি এ আবেদন করেন। এ সময় তার সঙ্গে ছিলেন বড় ভাই সুমন হোসেন।

আবেদনটিতে লিমন উল্লেখ করেন, চিকিৎসার কারণে অনেকদিন তিনি গ্রামের বাড়ি ছিলেন না। র‌্যাবের নিষ্ঠুর নির্যাতনে তার একটি পা কেটে ফেলতে হয়েছে। র‌্যাবের সোর্স পরিচয়দানকারী মো. ইব্রাহিম হাওলাদার, নান্নু হাওলাদার, মানিক জমাদ্দার, মুনসুর জমাদ্দার, বাদশা হাওলাদারসহ বেশ কয়েক জন ব্যক্তির ভয়ে পা কেটে ফেলার পর থেকেই তিনি গ্রামের বাড়িতে থাকতে পারেন না।

তারপরও ঈদের দিন গ্রামের বাড়িতে এলে মা হেনোয়ারা বেগম, বড় ভাই সুমন হোসেন ও তার ওপর হামলা চালায় র‌্যাবের সোর্স ইব্রাহিম। এতে তার মা আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন। এ অবস্থায় তিনি ও তার পরিবার জীবনের নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন।

লিখিত সব আবেদন জিডি হিসেবে রেকর্ড করা যায় না, বলেও বাংলানিউজকে বুধবার জানিয়েছিলেন রাজাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা(ওসি) তোফাজ্জেল হোসেন।

এরপর ২৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার দুপুর দেড়টার দিকে ইব্রাহিমের শ্যালক ফোরকানকে হত্যার অভিযোগে লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম, ভাই সুমন, বাবা তোফাজ্জেল হোসেনসহ ১০ জনকে অভিযুক্ত করে আদালতে হত্যা মামলা দায়ের করেন ইব্রাহিম। ঝালকাঠীর সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে এ মামলাটি দায়ের করা হয়।

যাদের অভিযুক্ত করা হয়েছে, তারা হলেন- লিমনের বড় ভাই সুমন, সাতুরিয়া ইউপির সাবেক চেয়ারম্যান হেমায়েত হোসেন নুরু, লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম, বড় মামা সিদ্দিক হাওলাদার, নৈকাঠি গ্রামের মফিজ শিকদারের ছেলে সুমন শিকদার, বাবা তোফাজ্জেল হোসেন, মোর্শেদ জমাদ্দার, ফিরোজ জমাদ্দার, মোতালেব হাওলাদার ও শাহীন হাওলাদার।

লিমন বাংলানিউজকে জানান, তার পরিবারের সদস্য এবং সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান ছাড়া সে অভিযুক্ত আর কাউকে চেনেন না। তিনি জানান, তার বাবা ঘটনার আগে থেকেই ঢাকায় অবস্থান করছেন।

অপরদিকে, ইব্রাহিমের আইনজীবী ফারুক হোসেন জানান, ঈদের দিন (২০ আগস্ট) ইব্রাহিমের শ্যালক ফোরকানকে (৩৮)লিমনের মা-ভাই ও বাবাসহ অভিযুক্ত ১০ জন মিলে পিটিয়ে হত্যা করেন, এমন অভিযোগ এনে এ হত্যা মামলাটি দায়ের করা হয়েছে।

মামলাটি দায়ের করার পর আদালতের বিচারক নুসরাত জাহান মামলাটি আমলে নিয়ে রাজাপুর থানার  ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জেল হোসেনকে ব্যবস্থা নেওয়ার আদেশ দিয়েছেন।

এ বিষয়ে লিমন বলেন, “সবাই জানেন, আমার মা ইব্রাহিমের হামলায় আহত হয়ে ওই সময় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিলেন। আমার ভাই ও আমি তার সেবা করছিলাম। তাহলে আমার বৃদ্ধা মা ও বড় ভাই কীভাবে হামলা চালালেন?

এছাড়া ঈদের দিন ইব্রাহিম যেখানে আমাদের ওপর হামলা করেছিলেন, সেখান থেকে প্রায় ১ কিলোমিটার দূরে ইব্রাহিমের শ্যালক মারা যান। তাও আমাদের ওপর হামলা করার ১ ঘণ্টা পর। তখন আমরা রাজাপুর স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে, আহত মাকে নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম।”

লিমন আরও বলেন, “আরেকটি মিথ্যা মামলায় জড়ানো হলো আমাদের। আমাদের হয়রানি করতে ও তারা নিজেরা বাঁচতে আমার মা-ভাইয়ের বিরুদ্ধে এ মিথ্যা মামলা দায়ের করেছেন।”

এ বিষয়ে রাজাপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. তোফাজ্জেল হোসেন বলেন, ‘‘শুনেছি একটি মামলা হয়েছে। তবে মামলার কাগজপত্র এখনও হাতে পাইনি। কাগজপত্র পেলে তদন্ত করে দেখবো।”

এক প্রশ্নের জবাবে ওসি বলেন, “ঈদের দিন ঈব্রাহিমের শ্যালক ফোরকান মারা যান। এ মৃত্যুকে কেন্দ্র করে অভিযোগ-পাল্টা অভিযোগ পাওয়া যায়। ইব্রাহিমরা বলছিলেন, তাকে পিটিয়ে হত্যা করেছেন লিমন ও তার সহযোগীরা। আবার লিমনরা বলেছেন, তারা কিছুই জানেন না। এখন লাশের ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন না পাওয়া পর্যন্ত কিছু বলতে পারছি না।’’

উল্লেখ্য, ২০১১ সালের ২৩ মার্চ র‌্যাবের গুলিতে পা হারান ঝালকাঠির কলেজছাত্র রাজাপুর উপজেলার সাতুরিয়া গ্রামের লিমন হোসেন।  র‌্যাবের বিরুদ্ধে একটি মামলা করেন লিমনের মা হেনোয়ারা বেগম।  মামলায় র‌্যাবকে ‘নির্দোষ’ দেখিয়ে গত ১৪ আগস্ট চূড়ান্ত প্রতিবেদন দিয়েছে পুলিশ।

একই ঘটনায় লিমনের বিরুদ্ধে র‌্যাবের দু’টি মামলায় লিমনকে দোষী সাব্যস্ত করে তার বিরুদ্ধে অভিযোগপত্র দেয় পুলিশ।

 

বাংলাদেশ