ফখরুলের আত্মগোপনে অসন্তুষ্ট তৃণমূল

ফখরুলের আত্মগোপনে অসন্তুষ্ট তৃণমূল

হঠাৎ করেই ইমেজ সঙ্কটে পড়েছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তাকেসহ সিনিয়র নেতাদের নামে দেওয়া পর পর দু’টি মামলা যেন অনেকটা ‘শাঁখের করাত’ হয়েই দেখা দিয়েছে। এর ধাক্কায় একদিকে লোকচক্ষুর আড়ালে থাকতে হচ্ছে তাকে, অপরদিকে দলীয় পরিমণ্ডলে চলছে নানামুখী সমালোচনা। ফখরুলের এই আত্মগোপন পর্বকে ‘আস্থা হারানোর পরিস্থিতি’ বলেই মনে করছেন তৃণমূল নেতা-কর্মীরা।

ইলিয়াস ইস্যুতে দ্বিতীয় দফায় ডাকা দু’দিনের হরতালের শেষ দিন সোমবার নয়াপল্টনে কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আসেননি ফখরুল। তিনি আসছেন বা আসবেন বলে দলের পক্ষ থেকে কর্মীদের আশ্বস্ত করা হলেও সরকার বিরোধী চলমান আন্দোলনের ‘প্রাণপুরুষ’ হয়ে ওঠা ফখরুলের খোঁজ মেলেনি সারাদিনেও। এমনকি পরের দিন মঙ্গলবারও না। বুধবারের বিক্ষোভেও দেখা মেলেনি কর্মীদের কাছে ‘রাজনৈতিক আইডল’ হয়ে ওঠা ফখরুলের। এরপর চলে গেলো বৃহস্পতিবারও।

গ্রেফতার এড়াতে তার এভাবে উধাও হওয়ার কৌশল কর্মীদের মর্মবেদনার অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কেউ কেউবা মনে জমা অসন্তোষ প্রকাশও করছেন অকপটে।

রাজনৈতিক কর্মসূচি আর দলীয় জমায়েতগুলোতে এখন ফখরুলসহ সিনিয়র নেতাদের অন্তর্ধানের গল্পই হচ্ছে ঘুরেফিরে। সরকারের কড়া সমালোচনার পাশাপাশি নিজ দলের নেতাদের সমালোচনাও হরহামেশা শোনা যাচ্ছে কর্মীদের মুখে।

ক্ষমতসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহবুব উল আলম হানিফের দেওয়া ‘এক মামলাতেই বিএনপি ঠাণ্ডা হয়ে গেছে’ শীর্ষক মন্তব্যও কর্মীদের অন্যতম মনোবেদনার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তারা মনে করছেন, মির্জা ফখরুলরা এভাবে গা-ঢাকা না দিলে সরকার পক্ষ আর যাই হোক এভাবে কথা বলতে পারতো না। কি হতো ফখরুল প্রকাশ্যে থাকলে? মাঠে থেকে গ্রেফতার হয়েছেন যুগ্ম-মহাসচিব রুহুল কবীর রিজভী। তার প্রতি কর্মীদের সহানুভূতি দারুণভাবে বেড়েছে। স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে গুলিবিদ্ধ হয়ে আজীবনের জন্য ‘খোঁড়া’ হয়ে যাওয়া সাবেক এই ছাত্রনেতা যদি অসুস্থ শরীরে দল টিকিয়ে রাখার আন্দোলন থেকে গ্রেফতার হতে পারেন, তাহলে তার নেতা ফখরুল কেন সুস্থ শরীরেও তা পারলেন না?’

কিন্তু উত্তর না পেয়ে কর্মীদের মনে তৈরি হওয়া এসব প্রশ্ন পরিণত হচ্ছে আক্ষেপে। তারা বলছেন, ‘নেতাদের সামনে রেখে এগুবো, পুলিশের পিটুনি খাবো, আটক হবো, সবই ঠিক আছে। কিন্তু এখন নেতারাই পিঠ বাঁচাতে ব্যস্ত। আমরা দলের সমর্থক হয়েও জানি না নেতারা কে কোথায় আছেন। তাহলে কিসের ভরসায় দলে থাকবে লোকজন?’

তবে বিভিন্ন স্তরের কর্মীদের এমন মনোকষ্টের সঙ্গে মিলছে না মামলা থেকে বেঁচে যাওয়া শীর্ষ নেতাদের সুর। রাজনৈতিক কৌশল হিসেবে ফখরুলের পালিয়ে থাকাটাকে তারা বরং সমর্থনই করছেন।

স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান সঙ্গে আলাপকালে এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘ইচ্ছে করে গ্রেফতার হওয়া কোনো বীরত্বের লক্ষ্মণ নয়। আমাদের দলের এসব নেতা প্রকাশ্যে ও অপ্রকাশ্যে দলের প্রতি সব দায়িত্ব পালন করছেন।’

তিনি বলেন, ‘সরকারের উদ্দেশ্য এমনই। দলের মহীরুহদের আটকে নির্যাতন করবে। দলকে দুর্বল করতে চায় তারা।’

সমর্থকদের অসন্তোষ প্রসঙ্গে নজরুল ইসলাম খান বলেন, ‘দলের যারা সত্যিকারের সমর্থক, তারা কখনো নেতাদের নিয়ে এমন ভাবতে পারে না। তারা পরিস্থিতি বোঝে। সরকারের কিছু দালাল আমাদের সমর্থকদের মধ্যে ভিড়ে যায়, আর নানা বাজে মন্তব্য করে হতাশা ও বিভ্রান্তি ছড়িয়ে সমর্থকদের মনোবল নষ্ট করতে চায়।’

এসবে দলের কোনো ক্ষতি হবে না বলে নিজের বিশ্বাসের কথাও জানান নজরুল ইসলাম খান।

তিনি আরো বলেন, ‘আমরা আদালতে কী ব্যবহার পাচ্ছি, তা আপনারা জানেন। সরকার বিচার বিভাগকে নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। কোনো নিয়মের ধার ধারছে না তারা। আমরা ন্যায়বিচার যেহেতু পাবো না, সেহেতু নিজেদের পরিশীলিত নিয়মে দলের কাজ করবো। সামনে এসে কোন মিথ্যা মামলার আসামি হয়ে সরকারের মনোবাসনা পূরণ করার কোনো দরকার দেখতে পাচ্ছি না।’

দলের ভাইস-চেয়ারম্যান আবদুল্লাহ আল নোমান এ প্রসঙ্গে বলেন, ‘নেতারা দলের সঙ্গে আছেন, এ মুহুর্তে মামলা নিয়ে কিছুটা ব্যস্ত আছি সবাই। সরকার চায় দুর্বলতা তৈরি হোক। কিন্তু তাদের চাওয়া পূরণ হওয়ার কোনো সম্ভাবনা নেই। বরং সরকার দুর্বল হয়ে গেছে। তাই এসব মামলা দিয়েছে। রিজভী আহমেদ, রতনের মতো নেতাকে গ্রেফতার করেছে।’

নোমান বলেন, ‘এমন প্রতিকূল পরিস্থিতিতে কর্মীরা আরো শক্তিশালী হবে, তাদের পরিপক্কতা বাড়বে। তাছাড়া কারো জন্য কিছু থেমে থাকে না। দল তার নিজস্ব নিয়মেই পরিচালিত হবে। আর সরকারের ষড়যন্ত্র প্রতিহত করতে ও অপপ্রচারে বিভ্রান্ত না হতে কর্মীদের আমরা সাহস যোগাবো।’

অচিরেই সব ঠিক হয়ে যাবে বলে আশা প্রকাশ করেন নোমান।

এদিকে দলটির স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ বৃহস্পতিবার জাতীয় প্রেসক্লাবে এক অনুষ্ঠানের শেষ দিকে দলের সমর্থকদের উদ্দেশ্যে বলেন, ‘নেতাকর্মীদের মিথ্যা মামলা দিয়ে ধরে নিয়ে রিমান্ড দেওয়া হচ্ছে। যার একমাত্র উদ্দেশ্য ইচ্ছেমত অত্যাচার করা। নেতারা সরকারের অত্যাচার থেকে বাঁচতে সরে আছেন। দলের জন্য যত যা করার সব কিছুই তারা করেছেন এবং এখনো করছেন। সরকারের কোনো ষড়যন্ত্রই দলের অভ্যন্তরে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলার ক্ষমতা রাখে না।’

রাজনীতি