সানডে টেলিগ্রাফে অ্যান্ড্রু গিলিগ্যানের কলাম ব্রিটেনপ্রবাসী মুঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনছে বাংলাদেশ

সানডে টেলিগ্রাফে অ্যান্ড্রু গিলিগ্যানের কলাম ব্রিটেনপ্রবাসী মুঈনুদ্দিনের বিরুদ্ধে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনছে বাংলাদেশ

ব্রিটেনে মুসলিম কমিউনিটির শীর্ষস্থানীয় নেতা  চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের অভিযোগ আনা হতে পারে। যুদ্ধাপরাধ ও মুক্তিযুদ্ধকালে সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্তকারী এবং সংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা প্রখ্যাত ব্রিটিশ সাংবাদিক অ্যান্ড্রু গিলিগ্যানকে জানিয়েছেন একথা।

ব্রিটেনের প্রভাবশালী দৈনিক টেলিগ্রাফ পত্রিকার লন্ডন এডিটর অ্যান্ড্রু গিলিগ্যান পত্রিকাটির রোববারের সংস্করণে (সানডে  টেলিগ্রাফ) এ নিয়ে একটি নিবন্ধে তুলে ধরেছেন এই তথ্য।

উল্লেখ্য, সম্প্রতি গিলিগানের নেতৃত্বে ব্রিটেনের একটি সাংবাদিক দল ঢাকা সফর করে গেছে। এসময় ১৯৭১’এ বাংলাদেশে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনালের তদন্তকারী কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেন অ্যান্ড্রু গিলিগ্যান ও তার সঙ্গীরা।

বাংলাদেশ সফর শেষ করে নিজ দেশ ব্রিটেনে ফিরে গিয়ে অ্যান্ড্রু গিলিগ্যান ১৫ এপ্রিল সংখ্যায় লেখা তার দীর্ঘ কলামে ব্রিটেনে একাধিক মুসলিম সংগঠনের প্রভাবশালী নেতা চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের যুদ্ধাপরাধের বিষয়টি বিস্তারিতভাবে সামনে আনলেন।
সানডে টেলিগ্রাফে লেখা কলামে তিনি বলেন, ‘‘বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে বেশ কিছু অপহরণ ও গুমের ঘটনায় জড়িত ছিলেন চৌধুরী মুঈনউদ্দিন।’’

তবে যাকে নিয়ে গিলিগ্যানের এই কলাম সেই মুঈনউদ্দিন এ অভিযোগ ‘মিথ্যা এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’ বলে দাবি করেছেন।

উল্লেখ্য, চৌধুরী মুঈনউদ্দিন নামের প্রবাসী এই বাংলাদেশি ব্রিটেনভিত্তিক ন্যাশনাল হেলথ সার্ভিস বা এনএইচএস’র মুসলিম স্পিরিচুয়াল কেয়ার প্রোভিজন বিভাগের পরিচালক, ব্রিটেনভিত্তিক দাতব্য প্রতিষ্ঠান মুসলিম এইডের অন্যতম ট্রাস্টি ও মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেন’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা।

গিলিগ্যানের নিবন্ধের উল্লেখযোগ্য দিক:
বাংলাদেশে মানবতার বিরুদ্ধে সংঘটিত অপরাধের বিচারের জন্য গঠিত আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রধান তদন্তকারী আব্দুল হান্নান খান বলেছেন, ‘‘১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় একের পর এক বুদ্ধজীবীকে হত্যার সঙ্গে চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের জড়িত থাকার ব্যাপারে যথেষ্ট তথ্য-প্রমাণ রয়েছে।’’

তিনি বলেন, ‘‘তার বিরুদ্ধে মামলা করার ব্যাপারে আমরা অনেক দূর এগিয়েছি। তাকে অভিযুক্ত না করা বা বিচারের মুখোমুখি না করার কোনো সুযোগ নেই। আমরা আশা করছি, জুনের মধ্যে তার বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন করা হবে।’’

মানবতাবিরোধী অপরাধ আইনে বিচারে দোষী সাব্যস্ত  হলে চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের মৃত্যুদণ্ডও হতে পারে।

এ বিষয়ে আইন ও বিচারমন্ত্রী শফিক আহমেদ এক বিবৃতিতে বলেছেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যায় তাকে (মুঈনউদ্দিন) হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছে। নিশ্চিতভাবেই তার বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হবে।’

জানা যায়, ১৯৭১’এ মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন মুইন উদ্দিন ঢাকায় ‘পূর্বদেশ’ নামে একটি পত্রিকার সাংবাদিক ছিলেন এবং তিনি সে সময় পাকিস্তানকে সমর্থনকারী দল জামায়াতে ইসলামীর সদস্য ছিলেন।

যুদ্ধের শেষের দিকে যখন পাকিস্তানের পরাজয় প্রায় নিশ্চিত তখন মুঈনউদ্দিনের আল বদর ব্রিগেডে যোগ দেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর দোসর এই আধাসামরিক সংগঠনটি সে সময় বাংলাদেশের অনেক বিশিষ্ট নাগরিককে নির্যাতন ও হত্যা করেছে।

এ রকম ঘটনার শিকার বাংলা সাহিত্যের একজন প্রখ্যাত ব্যক্তি মোফাজ্জল হায়দার চৌধুরীর বিধবা স্ত্রী ডলি চৌধুরী মুঈনউদ্দিনের অপরাধের বর্ণনা তুলে ধরে সাক্ষ্য দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ওই সময় তার স্বামীকে যে তিনজন অপরহরণ করে নিয়ে যায় তাদেরই একজন  ছিল এই মুঈনউদ্দিন। ১৪ ডিসেম্বর রাতে মোফাজ্জল হায়দারকে অপহরণ করা হয়। এরপর তাকে আর খুঁজে পাওয়া যায়নি।

দ্য সানডে টেলিগ্রাফকে ডলি চৌধুরী বলেছেন, ‘‘আমি মুঈনউদ্দিনকে চিনতে পেরেছিলাম।’’ তার এ সাক্ষ্য মুঈনউদ্দিনের বিরুদ্ধে মামলার একটি শক্ত ভিত হিসেবে বিবেচিত হবে।

তিনি আরো বলেছেন, ‘‘যখন তিনি ছাত্র ছিলেন তখন প্রায়ই আমার দেবরের কাছে আসতেন। আমার স্বামী, ননদ, দেবর সবাই তাকে চিনতাম।’’

সাংবাদিক সিরাজুদ্দিন হোসেনকে ১০ ডিসেম্বর রাতে বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে যাওয়া হয়। তার বিধবা স্ত্রী নুরজাহান সিরাজী দাবি করেছেন, তার স্বামীর অপহরণের সঙ্গে মুঈনউদ্দিন জড়িত।

তিনি বলেছেন, ‘‘কোনো সন্দেহ নেই, আমার স্বামীকে অপহরণ ও হত্যার সঙ্গে মুঈনউদ্দিন জড়িত ছিলেন।’’
পূর্বদেশের আরেক সাংবাদিক গোলাম মোস্তফা সে সময় নিখোঁজ হন। এই নিখোঁজ সাংবাদিকের ভাই দুলু মোস্তফা বলেছেন, তিনি ভাইকে খুঁজে বের করার ব্যাপারে মুঈনউদ্দিনের সহায়তা চান। এরপর তাকে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর প্রধান বন্দিশালা ও নির্যাতনকেন্দ্রে নিয়ে যান মুঈনউদ্দিন।

দুলু জানিয়েছেন, সেখানে গিয়ে মনে হয়েছে বন্দিশালায় মুঈন বেশ পরিচিত। তিনি সহজেই প্রবেশের অনুমতি পেলেন এবং পাকিস্তানি গার্ডরা তাকে স্যালুটও করেছিল। তবে গোলাম মোস্তফাকে আর পাওয়া যায়নি।

পূর্বদেশের তৎকালীন সম্পাদক আতিকুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তাদের জানিয়েছেন, মুঈনউদ্দিনই প্রথম সাংবাদিক যে আল বদর ব্রিগেডের অস্তিত্বের কথা প্রকাশ করে। আর এই সংগঠনের কার্যক্রম সম্পর্কে তার অনেক জানাশোনা ছিল।

আতিকুর রহমান আরো জানান, গোলাম মোস্তফা নিখোঁজ হওয়ার পর মুইন তার বাড়ির ঠিকানা চেয়েছিলেন। কিন্তু নিজেও অপহরণের শিকার হতে পারেন এই ভয়ে তিনি ভুয়া ঠিকানা দেন। যুদ্ধ শেষে তিনি (আতিকুর রহমান) নিজেকে আল বদরের হত্যা তালিকায় দেখতে পান।

তিনি বলেন, ‘‘আমি মুঈনউদ্দিনকে যে ঠিকানা দিয়েছিলাম পরে আল বদরের ওই তালিকা দেখে বুঝলাম তিনি সেটি আল বদরের কাছে দিয়েছিলেন। আর আমি নিশ্চিত, এই ঠিকানা অন্য কাউকে দিইনি।’’

মুস্তাকুর এবং মাহমুদুর রহমান নামে আরো দুই সাক্ষী দাবি করেছেন, ঢাকায় তৎকালীন বিবিসি করেসপন্ডেন্টকে খুঁজছিল এমন একটি সশস্ত্র গ্রুপের কয়েকজনকে তারা ছবিতে চিনতে পেরেছেন। বিবিসির সাংবাদিক কোনোভাবে পালিয়ে যেতে সক্ষম হওয়ায় তাকে অপহরণের মিশন ব্যর্থ হয়।

১৯৭০’র দশকে ব্রিটেনে আসার পর মুঈনউদ্দিন ব্রিটিশ নাগরিকত্ব পান। এরপর তিনি মুসলিম কমিউনিটির নেতা এবং অধিকারকর্মী হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে সক্ষম হন।

১৯৮৯ সালে ভারতীয় বংশোদ্ভূত ব্রিটিশ লেখক সালমান রুশদির বিতর্কিত উপন্যাস ‘স্যাটানিক ভার্সেস’র বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এই মুঈনউদ্দিন।

একই সময় তিনি চরমপন্থী বলে অভিযুক্ত ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপ (আইএফই), জামায়াতে

Andrew-Gilligan-sm

ইসলামীর ইউরোপ শাখা প্রতিষ্ঠা করেন। ২০১০ সালে লেবার পার্টির মন্ত্রী ফিৎজপ্যাট্রিক অভিযোগ করেন, মুঈনউদ্দিন গোপনে লেবার পার্টির মধ্যে প্রভাব বিস্তার এবং অনুপ্রবেশের চেষ্টা করছেন।

২০১০ সাল পর্যন্ত বিতর্কিত ইস্ট লন্ডন মসজিদের ভাইস চেয়ারম্যান ছিলেন মুঈনউদ্দিন। মসজিদটি পরিচালনা করে আইএফই। এই মসজিদের সম্প্রসারণকাজের উদ্বোধনের সময় ব্রিটিশ রাজপরিবারের উত্তরাধিকারী প্রিন্স চার্লসকে অভ্যর্থনা জানান তিনি। তিনি আইএফই প্রভাবিত মুসলিম কাউন্সিল অব ব্রিটেনের সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন।

এছাড়া, ইসলামিক ফোরাম অব ইউরোপের সঙ্গে সম্পর্ক রাখার অভিযোগে টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাচিত মেয়র লুৎফর রহমানকে লেবার পার্টি থেকে বহিষ্কার করা হয়।

বাংলাদেশ