তদন্ত শেষ হলেই ডেসটিনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা?

তদন্ত শেষ হলেই ডেসটিনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা?

হায় হায় কোম্পানি ডেসটিনির অবৈধ ও প্রতারণামূলক কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে নড়েচড়ে বসেছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও মন্ত্রণালয়। এ প্রতিষ্ঠানটির নানা ধরনের অবৈধ ও বাটপারি কার্যক্রম খতিয়ে দেখতে এরইমধ্যে কয়েকটি সংস্থা পৃথক কমিটি গঠন করেছে। যার তদন্ত কাজ এখন চলছে।

ওদিকে দিন দিন প্রতিষ্ঠানটির সাধারণ গ্রাহকদের হাহাকার বাড়ছে। ধীরে ধীরে মুখোশ খুলছে মিথ্যা আশ্বাস আর অতি লোভ দেখিয়ে ডেসটিনিতে বিনিয়োগ করতে উদ্বুদ্ধ করা প্রতিষ্ঠানটির প্রতারক কর্মীদের। একই সঙ্গে ডেসটিনির বিভিন্ন অফিস বন্ধ করে গা ঢাকা দিতে শুরু করেছে এর কর্মীরা।

কথিত মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) পদ্ধতিতে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানটির সবধরনের অনিয়ম, দুর্নীতি, প্রতারণা ও জালজালিয়াতি খতিয়ে দেখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংকসহ দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও একাধিক গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত কার্যক্রম এরইমধ্যে শুরু হয়েছে। সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে ডেসটিনির অর্থ পাচারের বিষয়টি। বিদেশে অর্থ পাচারের তদন্ত কাজে দুদকের চৌকস অফিসারদের নিয়োজিত করা হচ্ছে।

তদন্তের অংশ হিসেবে একটি বিশেষ গোয়েন্দা সংস্থা সোমবার জয়েন্ট স্টক কোম্পানি থেকে ডেসটিনি ও এর অন্যান্য সহযোগী প্রতিষ্ঠান সম্পর্কে বিভিন্ন রকমের তথ্য সংগ্রহ করেছে বলে দেশের একটি সংবাদমাধ্যম প্রকাশ করেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, ২০০৯-১০ অর্থবছরে ডেসটিনির পেইড অব ক্যাপিটাল (পরিশোধিত মূলধন) ছিল মাত্র ৩০০ কোটি টাকা, আশ্চর্য হলেও সত্য যে ২০১০-১১ অর্থবছরে এ অর্থ দেখানো হয় ১২০০ কোটি টাকা। অর্থাৎ এক অর্থবছরের ব্যবধানে ৩৫৪ শতাংশ মূলধন বৃদ্ধি পেয়েছে।

সোমবার দুদকের কমিশন সভায় এসব বিষয়ে আলোচনা শেষে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে ডেসটিনির অর্থ পাচারের ঘটনা তদন্ত করার জন্য একমত হন নির্বাহীরা।

এদিকে বাংলাদেশ ব্যাংকের ভিজিলেন্স টিম ছাড়াও অন্তত এক ডজন তদন্ত টিম এখন ডেসটিনির বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহে মাঠপর্যায়ে রয়েছে।

মঙ্গলবার দৈনিক মানবজমিন এক প্রতিবেদনে লিখেছে, ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের ঢাকা অফিসগুলোও বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। রাজধানীর ২৩টি অফিসের মধ্যে এরইমধ্যে ৫টি অফিস বন্ধ হয়ে গেছে। একই সঙ্গে ২৩টি কার্যালয়ের যোগাযোগের নম্বর এখন বন্ধ। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে ওইসব নম্বরে ফোন করেছেন গ্রাহকরা। কিন্তু নম্বর বন্ধ থাকায় কারও সঙ্গে তারা যোগাযোগ করতে পারেননি। এতদিন ওই নম্বরগুলোতেই দেশব্যাপী ছড়িয়ে থাকা ডেসটিনির বিপুল সংখ্যক বিনিয়োগকারীকে এসব নম্বর দেওয়া হয়েছিল। নম্বরগুলোর মধ্যে ১২টি এয়ারটেল মোবাইল নম্বর। বাকিগুলো গ্রামীণফোনের। এ অফিসগুলোতে কোন টিঅ্যান্ডটি সংযোগ নেই। ওদিকে অবৈধ ব্যাংকিং ও আইন বহির্ভূত কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার বিষয়ে সংবাদ প্রকাশিত হওয়ার পর ডেসটিনির অনেকেই গা-ঢাকা দিয়েছেন। এতদিন তাদের যেসব সদস্য সাধারণ মানুষকে রাজধানীতে বহুতল মার্কেট আর দিনে লাখ টাকা আয়ের স্বপ্ন দেখিয়ে এসেছেন তাদের তৎপরতাও কমেছে। হঠাৎ করে ডেসটিনির প্রশিক্ষণ কার্যক্রমও (সেমিনার) বন্ধ হয়ে গেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংক ডেসটিনির প্রতারণামূলক কর্মকাণ্ডে অধিক গুরুত্ব দিয়ে রোববার দু’টি নির্দেশনা জারি করেছে। তাতে এ প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে লেনদেন না করার জন্য জনগণকে ও বাংলাদেশ ব্যাংকের শাখা কর্মকর্তাদের সতর্ক থাকতে বলা হয়েছে।

নিরীহ ও সহজ সরল মানুষকে প্রতারণার হাত থেকে রক্ষা করতে শিগগিরই মাল্টিলেভেল মার্কেটিং (এমএলএম) আইন প্রণয়নের সুপারিশ করেছে সংসদীয় কমিটি। একই সঙ্গে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ডেসটিনির নানা ধরনের প্রতারণা খতিয়ে দেখতে ইতিমধ্যে পৃথক কার্যক্রম শুরু করেছে।

তবে ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেড সম্পর্কে সরকার এখন যেভাবে তৎপর হয়ে উঠেছে, এর ধারাবাহিকতা বজায় রেখে বাটপারি এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবে না তদন্তেই সার, তা দেখার অপেক্ষায় দেশের সচেতন জনসাধারণ।

কারণ হায় হায় এ প্রতিষ্ঠানটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে ২০১১ সালের ২৮ ডিসেম্বর ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেওয়া হয়েছিল। সে বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। একেক সময় সরকারের একেক সংস্থা এ বিষয়টিকে এড়িয়ে গেছে।

ডেসটিনির বিরুদ্ধে বিদেশে অর্থপাচারসহ গ্রাহকদের রাতারাতি বড়লোক বানানোর স্বপ্ন দেখিয়ে অবৈধ আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ রয়েছে অর্থ মন্ত্রণালয়, বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে। ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি নামের একটি আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিধি-বহির্ভূতভাবে আর্থিক লেনদেন করছে। এসব বিষয় খতিয়ে দেখতে অর্থ মন্ত্রণালয়ের পরামর্শে বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ১৩ ফেব্রুয়ারি জয়েন্ট স্টক কম্পানি ও ফার্মসমূহের পরিদপ্তরের রেজিস্ট্রার আহমেদুর রহিমকে প্রধান করে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে। ওই কমিটিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব, অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের একজন উপসচিব, বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের একজন উপসচিব, বাংলাদেশ ব্যাংকের একজন উপপরিচালক এবং সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) একজন উপপরিচালককে সদস্য হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। কমিটি ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির আর্থিক কার্যক্রম পর্যালোচনা এবং অবৈধ আর্থিক লেনদেনের বিষয়গুলো চিহ্নিত করে বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেবে।

গত ডিসেম্বর মাসে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের কাছে বাংলাদেশ ব্যাংকের পাঠানো এক চিঠিতে বলা হয়, মাল্টিলেভেল মার্কেটিং কম্পানি ডেসটিনি-২০০০ লিমিটেডের বিরুদ্ধে বিভিন্ন মহল থেকে অবৈধ কর্মকাণ্ডের অভিযোগ উত্থাপিত হচ্ছে। এ অবস্থায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি খতিয়ে দেখে প্রতিষ্ঠানটির অবৈধ কার্যক্রম বন্ধের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিবকে অনুরোধ করে বাংলাদেশ ব্যাংক। সম্প্রতি বাংলাদেশ ব্যাংকের আরেকটি পরিদর্শন প্রতিবেদনে ডেসটিনি মাল্টিপারপাস কো-অপারেটিভ সোসাইটির অবৈধ ব্যাংকিং কার্যক্রম, গ্রাহকদের প্রতারিত হওয়ার আশঙ্কার কথা উল্লেখ করে বলা হয়, প্রতিষ্ঠানটি যেকোনো সময় যুবক ও আইটিসিএলের মতো হতে পারে। এ ছাড়া গ্রাহকদের অর্থ ফেরত দেওয়ার ক্ষমতাও ডেসটিনির নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

ডেসটিনির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বাংলাদেশ ব্যাংক সম্প্রতি চিঠি চালাচালি শুরু করে। একটি অভিযোগের সূত্র ধরে কেন্দ্রীয় ব্যাংক ২০১১ সালের ১ ডিসেম্বর অর্থ মন্ত্রণালয়কে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম প্রতারণামূলক উল্লেখ করে এর বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানায়। চিঠিতে বলা হয়, বাণিজ্য ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে বিষয়টি আরও খতিয়ে দেখে যেন প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম বন্ধ করে দেওয়া হয়।

অর্থ বাণিজ্য