লোকসানি বিমানে ৫ বছরে বেতন বেড়েছে তিনগুণ!

লোকসানি বিমানে ৫ বছরে বেতন বেড়েছে তিনগুণ!

বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সকে লাভজনক প্রতিষ্ঠানে পরিণত করতে ২০০৭ সালে এর লোকবল কমিয়ে রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সকে কোম্পানিতে রূপান্তর করা হয়। অথচ গত প্রায় ৫ বছরে লোকবল কমলেও এয়ারলাইন্সের আয় বাড়েনি। উল্টো বিমানের শীর্ষপদসহ গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে বেতন বেড়েছে ৩ থেকে ৬ গুণ। বাংলানিউজের অনুসন্ধানে এ তথ্য বেরিয়ে এসেছে।

বিমান সূত্রে জানা গেছে, রাষ্ট্রীয় পতাকাবাহী এয়ারলাইন্সে লোকবল ছিল ৪৭০৬ জন। ২০০৭ সালের জুন মাসে সরকারি আদেশে স্বেচ্ছায় অবসর প্রকল্পের আওতায় (ভিআরএস) বিমানের লোকবল কমিয়ে ২৭৯২ জনে নামিয়ে আনা হয়। আর লোকবল ছাঁটাইয়ের মূল উদ্দেশ্যেই ছিল বিমানকে লাভজনক করা।

অনুসন্ধানে দেখা গেছে, বিমানের ভিআরএস’র আগে বিমানের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন ছিল প্রায় ১২ কোটি টাকা। তখন লোকবল ছিল ৪৭০৬ জন। এর ওভারটাইম ও ভাতা মিলিয়ে ব্যয় হতো ১ কোটি টাকা।

ভিআরএস’র পরে লোকবল ২৭৯২ জন হলে বিমানের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী বেতন বাবদ ব্যয় হয় ১৮ কোটি টাকা। এর সঙ্গে ওভারটাইম ও ভাতা মিলিয়ে ব্যয় হয় আরো ৩ কোটি ৬১ লাখ টাকার বেশি।

ভিআরএস’র আগে বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক বেতন পেতেন ৪০ হাজার টাকা। একজন পরিচালক বেতন পেতেন প্রায় ৫০ হাজার টাকা। মহাব্যবস্থাপক ও উপ-মহাব্যবস্থাপক পদে বেতন ছিল ৩০ হাজার টাকার মধ্যে।

ভিআরএস’র পর ব্যবস্থাপনা পরিচালকের বেতন হয়েছে ৩ লাখ টাকা। পরিচালক পদে বেতন ১ লাখ ৫০,৮০০ টাকা। এর মধ্যে অর্থ পরিচালকের বেতন ২ লাখ টাকা। প্রকৌশল পরিচালকের বেতনও দেড় লাখ টাকার বেশি। আগে চেয়ারম্যান হিসেবে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রী পরিচালনা পর্ষদের সভায় যোগদান বাবদ একটি ভাতা পেতেন। এখন চেয়ারম্যান হিসেবে এয়ার ভাইস মার্শাল জামাল উদ্দিন আহমেদ (অব.) ১ লাখ টাকা বেতন নিচ্ছেন।

অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বিমানের মাথাভারি প্রশাসনে ভিআরএস’র মাধ্যমে নিচের দিকের পদগুলোতে ব্যাপক ছাঁটাই করা হয়। কিন্তু উর্ধ্বতন পদগুলোতে পদ কিংবা লোকবল আগে যা ছিল এখনো তেমনই রয়েছে। ভিআরএস’র পূর্বে টেকনিক্যাল পদগুলো ছাড়া মহাব্যবস্থাপক পদ ছিল ১৭টি, উপ-মহাব্যবস্থাপক পদ ছিল ২৩টি। ভিআরএস’র পরেও সমসংখ্যক পদই রয়েছে। বরং এসব পদে বেতন ভাতা বেড়ে হয়েছে দ্বিগুণ, তিনগুণের বেশি।

রাষ্ট্রীয় এয়ারলাইন্সে শীর্ষকর্তা ব্যক্তিরা নিজেদের বেতন ভাতা কয়েকগুণ বাড়িয়ে নিলেও বিমানকে লাভজনক করা তো দূরের কথা দিন দিন লোকসানের পাল্লা ভারি হচ্ছে।

বিমানের এক পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০০৭ সালের জুনে ১৮৭৬ কর্মকর্তা-কর্মচারী ছাঁটাইয়ের পরেও তৎকালীন প্রশাসন প্রতিষ্ঠানের তহবিলে ৫০০ কোটি টাকা রেখে গিয়েছিল। গত অর্থবছরেও বিমান ১৯৯ কোটি টাকা লোকসান দিয়েছে।

জ্বালানি তেল সরবরাহকারী কোম্পানি বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কোম্পানি পদ্মার কাছে বিমানের দেনা ২৪৭ কোটি টাকা। বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ পাবে ২৭০ কোটি টাকা। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড পাবে ৫৬ কোটি টাকা। অপরদিকে পাওনা টাকা না দেওয়ায় বিদেশি পাওনাদার কোম্পানিগুলো বিমানের ইঞ্জিন-পার্টস আটকে রাখছে। মামলার হুমকি দিচ্ছে। স্পেয়ার পার্টসের অভাবে বহরের বেশিরভাগ উড়োজাহাজ বসে থাকে। ৪টি বিদেশি কোম্পানির কাছে এ মুহূর্তে বিমানের দেনার পরিমাণ প্রায় ২শ’ কোটি টাকা। এ কারণে ওই কোম্পানিগুলো মেরামতের জন্য দেওয়া বিমানের ডিসি-১০-৩০, এয়ারবাস ৩১০-৩২৫, এফ-২৮সহ ৪টি ইঞ্জিন আটকে দিয়েছে।

বিমানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক জাকীউল ইসলামের সঙ্গে যোগাযোগ করেও তাকে পাওয়া যায়নি।

এ বিষয়ে বিমান বাঁচাও ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মশিকুর রহমানের দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে তিনি বাংলানিউজকে বলেন, ‘বিমানের এসব অনিয়ম-দুর্নীতির বিরুদ্ধেই তারা আন্দোলন শুরু করেছেন। আর এসবই হচ্ছে পরিচালনা পর্ষদের অযোগ্যতার কারণে।’

অর্থ বাণিজ্য