‘মিয়ানমারকে দোষী প্রমাণে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে’

‘মিয়ানমারকে দোষী প্রমাণে যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত আছে’

রোহিঙ্গাদের ওপর চলমান নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞের বিষয়টি অনেক পুরনো হলেও এর পক্ষে তেমন তথ্য-উপাত্ত ছিল না। এসব হত্যাযজ্ঞ ও নির্যাতনের স্থানগুলোতে মিয়ানমার সবাইকে প্রবেশ করতেও দেয়নি। রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমার আন্তর্জাতিক দায়মুক্তি পেয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক আদালতে মিয়ানমারকে দোষী প্রমাণের জন্য যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। সরকারের দায়িত্ব হবে আগামী ১১ জুনের মধ্যে যথাযথভাবে সেসব তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের পাশাপাশি রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও অন্যান্য তৎপরতা অব্যাহত রাখা।

আজ সোমবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব নওয়াব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ‘আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত এবং রোহিঙ্গা সংকট’ শীর্ষক এক আন্তর্জাতিক সেমিনারে বিশেষজ্ঞরা এ মত দেন।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিসের ভারপ্রাপ্ত পরিচালক মনজুর হাসান বলেন, ‘যদিও জাতিসংঘ রোহিঙ্গাদের উপর চলমান হত্যাকাণ্ডকে জাতিনিধনের দৃষ্টান্ত হিসেবে উল্লেখ করেছে, কিন্তু সে বিষয়ে আন্তর্জাতিক প্রধান শক্তিগুলো তেমন তৎপরতা দেখায়নি। এই সমস্যার সমাধানে আমাদেরকেই সব থেকে বেশি সক্রিয় হতে হবে এবং সঠিকভাবে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য যাবতীয় শান্তিপূর্ণ পথগুলোতে চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। এর মধ্যে আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত অন্যতম।’

এরপর রোম চুক্তির বিভিন্ন ধারায় মিয়ানমারকে দোষী প্রমাণের বিষয়গুলো তুলে ধরেন বিচারপতি সাঈদ রিফাত আহমেদ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আইন বিশেষজ্ঞ কেট ভিগনেসওয়ারেন।

তারা বলেন, রোহিঙ্গাদেরকে বাড়িঘর থেকে উচ্ছেদ করে বাংলাদেশের সীমান্তে ঠেলে দেওয়া হয়েছে, যার যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত রয়েছে। যদিও মিয়ানমার আন্তর্জাতিক আদালতের এখতিয়ারভুক্ত দেশ নয়, তারপরেও মিয়ানমার যে জোরপূর্বক রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে পাঠিয়েছে এই ইস্যুতে আন্তর্জাতিক আদালত কাজ করতে পারে। যথাযথভাবে তথ্য-উপাত্ত উপস্থাপনের পাশাপাশি সংকট সমাধানে রাজনৈতিক, কূটনৈতিক এবং অর্থনৈতিক তৎপরতা অব্যাহত রাখতে হবে।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, ‘রোহিঙ্গা সমস্যা নিয়ে সবাই কথা বললেও এত দিনে কেউ কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করেনি। এ ধরনের মানবিক বিপর্যয়মূলক পরিস্থিতিতে কেউ তেমন কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারেনি। ৭০, ৮০ এবং ৯০ এর দশকে রোহিঙ্গারা এ দেশে আসতে বাধ্য হয়েছিলো, কিন্তু তখন এসব কর্মকাণ্ডের তেমন কোনো তথ্য-উপাত্ত ছিল না। এখন তথ্য-প্রযুক্তির যুগ। মিয়ানমারকে দোষী সাবস্ত করার মতো যথেষ্ট তথ্য-উপাত্ত সবার হাতে রয়েছে।

মিয়ানমারের গণতন্ত্র দেশটির সেনাবাহিনীর নিয়ন্ত্রণে উল্লেখ করে অধ্যাপক ইমতিয়াজ আরও বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারকেই করতে হবে এবং এজন্য দেশটিতে গণতন্ত্র ও ন্যায় বিচার প্রতিষ্ঠা গুরুত্বপূর্ণ। রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়ে দেশটির মানুষের মতামত ঠিকভাবে উঠে আসছে না।

রোহিঙ্গা ইস্যুতে মিয়ানমারকে হাত করতে ভারতের কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের বিষয়ে তিনি বলেন, ভারত ভেবেছিলো এই ইস্যুতে নিরব থেকে মিয়ানমারকে হাত করবে। মূল প্রতিযোগিতা ছিল চীনের সঙ্গে। কিন্তু তাদের মনে রাখা উচিত ছিলো মিয়ানমারের সঙ্গে চীনের সম্পর্ক খুবই ভাল এবং গভীর। তবে এখন ভারত মুখ খুলতে শুরু করেছে।

ধীরে ধীরে সবাই এই সংকট নিয়ে কথা বলবেন এবং এর সমাধানে এগিয়ে আসবেন বলে আশা প্রকাশ করে তিনি বলেন, বাংলাদেশের উচিত হবে রাশিয়ার সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কথা বলা। সব থেকে ভাল হয় দেশটির প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনকে এখন বাংলাদেশ সফরের আমন্ত্রণ জানানো গেলে। তাহলে সেটি হবে বড় ধরনের অগ্রগতি।

মিয়ানমারের উপর চাপ সৃষ্টিতে গণমাধ্যমের ভূমিকার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সবার দৃষ্টি মিয়ানমারের দিকে রাখতে হবে। এই সংকট বহুদিন ধরে চলছে। এখন গণমাধ্যমের ফোকাস রোহিঙ্গা শরণার্থীদের দিকে। আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের পাশাপাশি ফলোআপ প্রতিবেদন প্রকাশ করে বাংলাদেশের গণমাধ্যম মিয়ানমারকে চাপে রাখতে পারে।

সমাপনি বক্তব্যে একশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, ‘মিয়ানমারকে যতক্ষণ পর্যন্ত আইনী বাধ্যবাধকতায় আওতায় আনা না যায়, ততক্ষণ তারা বিতাড়িত রোহিঙ্গাদের ফেরত নেবে না। সেকারণে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালত ও জাতিসংঘকে উদ্যোগী হয়ে মিয়ারমারকে বিচারের আওতায় আনতে হবে। বাংলাদেশ যেহেতু আইসিসি-এর সদস্য, সেক্ষেত্রে তদন্ত ও বিচার কাজে আমরা বিশেষ ভূমিকা রাখতে পারি । এজন্য বাংলাদেশ সরকারের উচিত আইসিসির চাওয়া তিনটি বিষয়ে তথ্য প্রমাণ দেয়া।’

সেমিনারে রোহিঙ্গা সংকট নিয়ে সবার করণীয় নিয়ে ১১ দফা ঢাকা ঘোষণা দেওয়া হয়।

প্রসঙ্গত, গত ৯ এপ্রিল রোহিঙ্গা সংকট বিষয়ে আন্তর্জাতিক আদালত তার ক্ষমতা প্রয়োগ করতে পারে কি না এ বিষয়ে আদেশ জারি করা হয়। যদিও মিয়ানমার চুক্তিতে সই করেনি, তারপরেও তারা জোরপূর্বক নিজ দেশের নাগরিককে অন্য দেশের সীমানায় তাড়িয়ে দিয়েছে, এটি আন্তর্জাতিক আইনে বিচারযোগ্য। বাংলাদেশ রোম চুক্তিতে সই করা অন্যতম দেশ। এরপর ১১ এপ্রিল এ যুক্তির পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়া হয়। আগামী ১১ জুনের মধ্যে বাংলাদেশকে লিখিত মতামত জমা দিতে বলা হয় এবং এই বিষয়ে আগামী ২০ জুন শুনানি অনুষ্ঠিত হবে। সে প্রেক্ষাপটেই এই সেমিনারের আয়োজন করে একশন এইড বাংলাদেশ, সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ এবং সেন্টার ফর পিস অ্যান্ড জাস্টিস।

Leave a Reply