মাদকবিরোধী অভিযানে কাউন্সিলরসহ নিহত ৯

মাদকবিরোধী অভিযানে কাউন্সিলরসহ নিহত ৯

সারাদেশে মাদকবিরোধী অভিযানে বিভিন্ন জেলায় পুলিশ ও র‌্যাবের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে ৯ জন নিহত হয়েছেন।

শনিবার রাতে নিহত এ ব্যক্তিদের মধ্যে মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে ইয়াবা আসার মূল ট্রানজিট পয়েন্ট কক্সবাজারের একজন নির্বাচিত কাউন্সিলরও আছেন। নিহত একরামুল হক টেকনাফ পৌরসভার ৩ নম্বর ওয়ার্ড কাউন্সিলর ছিলেন।

এ ছাড়া চট্টগ্রাম, খুলনা, বাগেরহাট, ঝিনাইদহ, চাঁদপুর, কুষ্টিয়া, ময়মনসিংহ ও নোয়াখালীতে নিহত হয়েছেন বাকি ৮ জন।

এ নিয়ে ৮ দিনে টানা ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনায় সারাদেশে ৭০ জনের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন।

কক্সবাজার : জেলার টেকনাফ পৌরসভার কাউন্সিলর একরামুল হক ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হয়েছেন।

গতকাল শনিবার দিবাগত রাত ১টার দিকে মেরিন ড্রাইভ সড়কের নোয়াখালীয়া পাড়ায় এ ঘটনা ঘটে।

একরামুল স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তালিকাভুক্ত ইয়াবা ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি টেকনাফ পৌর আওয়ামী যুবলীগের সাবেক সভাপতি এবং তিনবার কাউন্সিলর নির্বাচিত হয়েছিলেন।

র‌্যাব-৭ কক্সবাজার ক্যাম্পের কোম্পানি কমান্ডার মেজর রুহুল আমিন দাবি করেন, একরামুলের অবস্থান জানতে পেরে মেরিন ড্রাইভ সড়কের টেকনাফের নোয়াখালী পাড়ায় র‌্যাব অভিযান শুরু করে। তখন একদল ইয়াবা ব্যবসায়ী র‌্যাবকে লক্ষ্য করে গুলি করে। র‌্যাবও পাল্টা গুলি চালায়। একপর্যায়ে ইয়াবা ব্যবসায়ীরা পালিয়ে যায়। ঘটনাস্থল থেকে একজনের মৃতদেহ উদ্ধার করা হয়। পরে স্থানীয়রা কাউন্সিলর একরামুলকে শনাক্ত করেন।

সেখান থেকে ১০ হাজার ইয়াবা, একটি বিদেশি পিস্তল, একটি ওয়ান শুটারগান উদ্ধার করা হয়েছে।

মৃতদেহটি টেকনাফ থানাপুলিশের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

টেকনাফ থানার (ওসি) রনজিত কুমার বড়ুয়া জানান, ময়নাতদন্তের জন্য একরামুলের মৃতদেহ কক্সবাজার সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে। তার বিরুদ্ধে টেকনাফসহ বিভিন্ন থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

ময়মনসিংহ : শহরের মরাখলা এলাকায় গতকাল রাতে কথিত বন্দুকযুদ্ধে এক অজ্ঞাত যুবক নিহত হয়েছেন।

জেলা গোয়েন্দা (ডিবি) পুলিশের ওসি মো. আশিকুর রহমান বলেন, রাত দেড়টায় মরাখলা এলাকায় মাদক ভাগাভাগি করছিল ব্যবসায়ীরা, এমন সংবাদ পেয়ে পুলিশ সেখানে অভিযান চালায়। এ সময় মাদক ব্যবসায়ীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও গুলি করে। একজন গুলিবিদ্ধ হয়। তাকে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি জানান, এ সময় ডিবি পুলিশের দুই কনস্টেবল হুমায়ুন ও আমির হামজা গুরুতর আহত হন।

ঘটনাস্থল থেকে ১০০ গ্রাম হেরোইন, ৪টি গুলির খোসা, দুটি রামদা এবং ১০০ ইয়াবা উদ্ধার করা হয়।

চট্টগ্রাম : জেলার সীতাকুণ্ডে পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে রায়হান উদ্দিন (২৮) নামে একজন নিহত হন।

শনিবার দিনগত রাত ১টার দিকে বন্দুকযুদ্ধের এ ঘটনা ঘটে।

তার বিরুদ্ধে খুন, ডাকাতি ও মাদকের ৭টি মামলা রয়েছে জানায় পুলিশ।

নিহত রায়হানের বাড়ি সীতাকুণ্ডের গোলবাড়িয়া এলাকায়।

সীতাকুণ্ড থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সৈয়দ ইফতেখার হাসান বলেন, ইয়াবা পাচারের খবরে’ পুলিশের একটি দল রাত ১টার দিকে নড়ালিয়া বেড়িবাঁধ এলাকায় অভিযানে যায়। সেখানে ইয়াবা পাচারকারীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। এক পর্যায়ে পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। পরে সেখানে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় রায়হানের মৃতদেহ পাওয়া যায়।

ঘটনাস্থল থেকে দুটি আগ্নেয়াস্ত্র, পাঁচ হাজার ইয়াবা, ২০ রাউন্ড গুলি ও দুটি ধারাল অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

বাগেরহাট : জেলার চিতলমারী উপজেলায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে মিথুল বিশ্বাস (৩২) নামে এক মাদক বিক্রেতা নিহত হয়েছেন।

আজ ভোরে উপজেলার কলাতলা ইউনিয়নের পিংগুড়িয়া এলাকায় এ ‘বন্দুকযুদ্ধের’ ঘটনা ঘটে।

নিহত মিথুল ওই এলাকার বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে বাগেরহাটের বিভিন্ন থানায় হত্যা, মাদক ও পুলিশের ওপর হামলাসহ ২০টি মামলা রয়েছে।

চিতলমারী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) অনুকূল বিশ্বাস দাবি করেন, মিথুল দীর্ঘদিন ধরে মাদক বিক্রি করে আসছিলেন। গত রাতে পুলিশ তার মাদক বিক্রির আস্তানায় হানা দেয়। এ সময় তার দলবল পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও পাল্টা গুলি করে। গুলিবিদ্ধ অবস্থায় মিথুল পালিয়ে যাওয়ার সময় পুলিশের হাতে আটক হন। তাকে চিতলমারী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন। লাশ বাগেরহাট সদর হাসপাতাল মর্গে পাঠানো হয়েছে।

পুলিশ ঘটনাস্থল থেকে দুই কেজি গাঁজা, ১০টি ইয়াবা, একটি শার্টারগান ও দুটি গুলি উদ্ধার করে বলেও জানান তিনি।

নোয়াখালী : জেলার সোনাইমুড়ির বগাদিয়া গ্রামে গতকাল মধ্যরাতে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ হাসান ওরফে ‘ইয়াবা হাসান’ নিহত হয়েছেন। তাকে গতকাল দুপুরে সোনামুড়ি বাজার থেকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।

হাসান সোনাইমুড়ি থানার ভানুয়াই গ্রামের বাসিন্দা। তার বিরুদ্ধে সোনাইমুড়ি থানায় মাদক ও অস্ত্রসহ মোট ২১টি মামলা রয়েছে।

জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার একেএম জহিরুল ইসলাম দাবি বলেন, হাসানকে আটকের পর তাকে নিয়ে বগাদিয়া গ্রামে ইয়াবা উদ্ধারে যায় পুলিশ। তখন ওত পেতে থাকা সন্ত্রাসীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি করে। পুলিশও পাল্টা গুলি করে। এতে ঘটনাস্থলেই গুলিবিদ্ধ হয়ে মারা যান হাসান।

তিনি জানান, ঘটনাস্থল থেকে একটি এলজি, সাতটি গুলি ভর্তি কার্তুজ, ১২০টি ইয়াবা উদ্ধার করা হয়। এ সময় তিন পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। তাদের বজরা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

চাঁদপুর : চাঁদপুরের মতলব দক্ষিণ উপজেলায় ‘বন্দুকযুদ্ধে’ সেলিম নামের এক ‘মাদক ব্যবসায়ী’ নিহত হয়েছেন।

মতলব দক্ষিণ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. কুতুব উদ্দিন বলেন, ভোর রাত পৌনে ৩টায় মতলব সড়কের হাজীর ডোন এলাকায় অভিযান চালিয়ে ৭ মাদক মামলার আসামি সেলিমকে আটক করা হয়। এ সময় সেলিমের সহযোগীরা পুলিশের ওপর গুলি ও হামলা চালায়। পুলিশও পাল্টা গুলি চালায়। এতে সেলিম গুলিবিদ্ধ হন। তাকে মতলব উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নেওয়া হলে চিকিৎসক মৃত ঘোষণা করেন।

তিনি আরও জানান, এ ঘটনায় ৪ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। এ ছাড়া ৪টি গুলি, ছয়টি কার্তুজ, ১১০টি ইয়াবা ও দুটি দেশীয় অস্ত্র উদ্ধার করা হয়েছে।

ঝিনাইদহ : জেলার শৈলকুপায় রফিকুল ইসলাম লিটন (৪০) নামে একজনের গুলিবিদ্ধ লাশ পাওয়া গেছে।

পুলিশের দাবি, তিনি চিহ্নিত মাদক বিক্রেতা।

রাত ১টার দিকে ঝিনাইদহ-কুষ্টিয়া মহাসড়কের পাশে শৈলকুপা উপজেলার বড়দাহ জামতলা এলাকায় লিটনের লাশ পাওয়া যায়।

শৈলকুপা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আলমগীর হোসেন বলেন, রাত ১টার দিকে গোলাগুলির খবর পেয়ে মহাসড়কে থাকা টহল পুলিশ সেখানে পৌঁছে। ঘটনাস্থলে একজনের গুলিবিদ্ধ লাশ পড়ে থাকতে দেখে। পরে তার পরিচয় জানতে পারে পুলিশ।

লিটন শৈলকুপা উপজেলার শেখপাড়া গ্রামের হাকিম মোল্লার ছেলে। তার বিরুদ্ধে ১০টি মাদকের মামলাসহ ১২টি মামলা আছে।

ঘটনাস্থল থেকে ১টি ওয়ান শুটার গান, ৫ রাউন্ড গুলি, অনেকগুলো ব্যবহৃত গুলির খোসা, ১০ বোতল ফেনসিডিল ও ৪০০টি ইয়াবা ট্যাবলেট উদ্ধার করা হয়।

খুলনা : দিঘলিয়া উপজেলায় কথিত বন্দুকযুদ্ধে আবুল কালাম মোল্লা (৪০) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

কালামের বিরুদ্ধে ৫টি মাদক মামলা রয়েছে। তার বাড়ি যশোরের অভয়নগর উপজেলার সিদ্দিপাশা গ্রামে।

খুলনার পুলিশ সুপার এসএম শফিউল্লাহ বলেন, কালাম উপজেলার বারাকপুর গ্রামে তার ভগ্নিপতির বাড়িতে আত্মগোপন করে ছিলেন। খবর পেয়ে ১০০ ইয়াবাসহ তাকে গ্রেফতার করা হয়। পরে বারাকপুর নদীর কূলে শ্মশানঘাটে কালামকে নিয়ে মাদক উদ্ধারে গেলে কালামের সহযোগীরা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছোড়ে। পুলিশও পাল্টা গুলি করে। এক পর্যায়ে গুলিবিদ্ধ হয়ে কামালের মৃত্যু হয়।

ঘটনাস্থল থেকে একটি শটগান, একটি হাতবোমা, এক রাউন্ড গুলি ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।

মেহেরপুর : জেলার গাংনী উপজেলায় দুই দল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে গোলাগুলির সময় হাফিজুর রহমান হাফি (৪৮) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

হাফিজুর রহমান হাফি গাংনী সরকারি ডিগ্রি কলেজপাড়ার বাসিন্দা। তার নামে গাংনী থানায় মাদকের দুই ডজনের বেশি মামলা রয়েছে।

গাংনী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) হরেন্দ্রনাথ সরকার বলেন, রাত আড়াইটার দিকে গাড়াবাড়য়ী গ্রামের বাথানপাড়া মাঠে দুই দল মাদক ব্যবসায়ীর মধ্যে গোলাগুলির খবর পায় পুলিশ। পুলিশ গিয়ে সেখান থেকে গুলিবিদ্ধ এক ব্যক্তিকে উদ্ধার করে গাংনী উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঠায়। সেখানে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। পরে স্থানীয় লোকজন তাকে শনাক্ত করেন।

ঘটনাস্থল থেকে বস্তাভর্তি ১১২ বোতল ফেনসিডিল ও একটি পিস্তল উদ্ধার করা হয় বলেও জানায় পুলিশ।

কুষ্টিয়া : সদর উপজেলায় পুলিশের সঙ্গে কথিত বন্দুকযুদ্ধে হালিম মণ্ডল (৩৫) নামে এক ব্যক্তি নিহত হয়েছেন।

শনিবার দিনগত রাত দেড়টার দিকে শহরের হাউজিং ডি ব্লক মাঠে এ গোলাগুলির ঘটনা ঘটে।

নিহত হালিম সদর উপজলার বড়িয়া গ্রামের সেলিম মণ্ডলের ছেলে।

পুলিশের দাবি, নিহত হালিম পুলিশের তালিকাভুক্ত মাদক ব্যবসায়ী।

কুষ্টিয়া মডেল থানার ওসি নাসির উদ্দিন বলেন, মাদক কেনাবেচার জন্য একদল মাদক বিক্রেতা সদরের হাউজিং ডি ব্লক মাঠে অবস্থান করছে খবরে সেখানে অভিযান চালায় পুলিশ। এ সময় মাদক বিক্রেতারা পুলিশকে লক্ষ্য করে গুলি ছুড়লে পুলিশও পাল্টা গুলি করে। এক পর্যায়ে মাদক বিক্রেতারা পিছু হটলে হালিমকে গুলিবিদ্ধ অবস্থায় পাওয়া যায়। তাকে উদ্ধার করে জেলা সদর হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে কর্তব্যরত চিকিৎসক হালিমকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঘটনাস্থল থেকে একটি শুটারগান, একটি পাইপ গান, তিন রাউন্ড গুলি ও ৮০০ ইয়াবা উদ্ধারের কথাও জানিয়েছে পুলিশ।

Leave a Reply